ফিলিস্তিনি দুই বন্দুকধারীর হামলায় ইসরায়েলের দুই সেনা নিহত হওয়ার পর অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভাঙতে শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে হামলাকারীদের বসবাসের এলাকাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) হেবরনের বাইরে একটি চেকপোস্টে এ হামলার ঘটনা ঘটে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় ইসরায়েলের দুই সেনা নিহত এবং আরও তিনজন আহত হন। পরে ইসরায়েলি সেনাদের পাল্টা গুলিতে দুই হামলাকারী নিহত হন।
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, হামলাকারীরা যে এলাকা থেকে এসেছেন, সেটি ধ্বংস করে সেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হবে। পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করছেন তিনি।
বিবিসির যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে হামলার সময় ইসরায়েলি সেনা ও বন্দুকধারীদের মধ্যে গোলাগুলির দৃশ্য দেখা গেছে। অন্য একটি ভিডিওতে দুই বন্দুকধারীকে গাড়ি থেকে নেমে পিস্তল ও অ্যাসল্ট রাইফেলের মতো অস্ত্র দিয়ে চেকপোস্টে গুলি চালাতে দেখা যায়। জবাবে ইসরায়েলি সেনারাও গুলি চালান।
পশ্চিম তীরে বাড়ছে উত্তেজনা
এ হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনাও ঘটছে। এর মধ্যেই চার দিন পর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
হামলার পর নেতানিয়াহু জানান, তাঁর দল লিকুদ পার্টি শুক্রবার সকালের নির্ধারিত নির্বাচনি প্রচারণা বাতিল করবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে চলা নির্বাচনি প্রচারণায় এ ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, হামলাকারীদের এলাকা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে এবং সেটিকে পুরোপুরি বদলে দেওয়া হবে। এর আগে ইসরায়েলি বাহিনী দেশটির নাগরিকদের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস করেছে। তবে ইসরায়েলের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ধরনের পদক্ষেপকে সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে সমালোচনা করে আসছে।
পশ্চিম তীরের শরণার্থীশিবিরগুলোতে আগে পরিচালিত সামরিক অভিযানের কথাও উল্লেখ করেছেন নেতানিয়াহু। সেসব অভিযানে আবাসিক ভবন ধ্বংসের পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন।
তিনি আরও জানান, কয়েক দশকের মধ্যে পশ্চিম তীরে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনা করেছেন। তবে কবে নাগাদ এ অভিযান শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। পাশাপাশি প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস হেবরন ও পার্শ্ববর্তী হালহুল শহরের চারপাশে অবরোধ আরোপের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
পশ্চিম তীরে আরও বড় অভিযানের আহ্বান
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ পশ্চিম তীরে গাজা কিংবা লেবাননের মতো সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলেছেন।
এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বৃহস্পতিবার বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে সরকারকে দুর্বল করার অভিযোগ করেন। ভবিষ্যতে দেশে কোনো হামলার ঘটনা ঘটলে তার দায় বিরোধী নেতাদের নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট নিহত সেনাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হামলাকারীদের প্রতিহত করে হত্যা করা ব্যক্তিদের প্রশংসা করেছেন তাঁরা।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হামলাকারীদের ব্যবহৃত গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর ধারণা, বন্দুকধারীরা কাছের রুট-৩৫ মহাসড়কে আরও বড় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে চেকপোস্টের সামনে পড়ে যাওয়ায় তাঁরা সেখানে গুলি চালান।
চলতি বছরে পশ্চিম তীরে প্রাণহানি
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ৯৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলায় পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকসহ চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে শুক্রবারের হামলায় নিহত ব্যক্তিরা এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নন।
হেবরনের হামলার পর ইসরায়েলি সরকারের সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিতে পশ্চিম তীরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সম্ভাব্য অভিযানের সময় ও পরিধি এখনো স্পষ্ট না হলেও এর ফলে বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সান নিউজ/ রাব্বি
