পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহু বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াত আরও সহজ হয়েছে। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী এই রেলপথ ব্যবহার করছেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্বপ্নের রেলপথ এখন নতুন এক নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
বিশেষ করে মাদারীপুরের শিবচর এলাকায় রেললাইনের সিগন্যাল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও ক্যাবল চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে রেললাইনে অসচেতন চলাচল ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও বাড়ছে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সিগন্যালের যন্ত্রাংশ চুরি বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক মাসে ঢাকা-ভাঙ্গা রেলপথের বিভিন্ন স্টেশনে সিগন্যাল ব্যবস্থার ট্র্যাক পটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। বিশেষ করে শিবচর ও পদ্মা রেলস্টেশন এলাকায় একাধিকবার একই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি জুন মাসেই একাধিক রাতে সিগন্যাল পয়েন্টের ট্র্যাক পট খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর আগেও মার্চ মাসে একই ধরনের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকজনকে আটক করলেও চুরি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
রেল কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ায় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।
ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন পরিচালনা
রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, স্বাভাবিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে কর্মীদের মাঠে দাঁড়িয়ে ‘লুক স্টিক’ ব্যবহার করে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করতে হয়। এতে কর্মীদের নিজের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
স্টেশন মাস্টারদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দাবি জানানো হয়েছে।
টহল বাড়ানোর উদ্যোগ
ভাঙ্গা রেলওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ভাঙ্গা জংশন থেকে শিবচর ও পদ্মা স্টেশনের দূরত্ব বেশি হওয়ায় নিয়মিত টহলে কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই সুযোগেই দুর্বৃত্তরা রেললাইনের মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি করছে।
পুলিশের দাবি, আগের ঘটনাগুলোতে মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। ভবিষ্যতে টহল আরও জোরদার করে সরকারি সম্পদ রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আড়াই বছরে প্রাণ গেছে অন্তত ২৫ জনের
রেললাইন চালুর পর থেকে আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই বছরে শুধু শিবচর এলাকায় অন্তত ২৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এর মধ্যে নারী, শিশু, কিশোর ও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিও রয়েছেন। অধিকাংশ দুর্ঘটনা সন্ধ্যার পর কিংবা মানুষের ভিড়ের সময় ঘটেছে।
বেড়েছে রেললাইনে মানুষের ভিড়
স্থানীয়দের মতে, নতুন রেললাইন চালুর পর অনেকেই বিকেলে পরিবার নিয়ে রেললাইনের পাশে ঘুরতে আসেন। অনেকেই রেললাইনের ওপর হেঁটে বেড়ান কিংবা ছবি তোলেন। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ এই এলাকায় বেড়াতে আসেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুতগতির ট্রেনের গতি অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে ভুলভাবে ধীর মনে হয়। ফলে ট্রেনের দূরত্ব ভুল হিসাব করে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হন।
সচেতনতার অভাব বড় কারণ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক মানুষ ট্রেনের সময়সূচি সম্পর্কে অবগত নন। আবার কেউ কেউ অসাবধানতাবশত রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে।
এছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যা কিংবা অপরাধমূলক ঘটনাও তদন্তের দাবি রাখে। তাই প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি রেলপথে নিরাপত্তা নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মনে করছে, যন্ত্রাংশ চুরি বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
অন্যদিকে দুর্ঘটনা কমাতে রেললাইনের পাশে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বেড়া স্থাপন, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টহল পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পদ্মা সেতুর রেলপথ যেন উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেই পরিচিত থাকে, আতঙ্ক কিংবা মৃত্যুফাঁদ হিসেবে নয়। নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।
