দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত জুলাই মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং আরও ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৫৭ জন নারী ও ৪৮ জন শিশু রয়েছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৮ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে মোট ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩৫ শতাংশ। এছাড়া পথচারী নিহত হয়েছেন ১০৬ জন এবং চালক ও তাদের সহকারীদের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, থ্রি-হুইলারের যাত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯৪ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনে ২৬ জন, বাসে ২১ জন এবং ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্রলিতে ভ্রমণকারী ১৯ জন নিহত হয়েছেন।
জাতীয় মহাসড়কেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি। জুলাই মাসে জাতীয় মহাসড়কে ১৬৯টি, আঞ্চলিক সড়কে ১৫৫টি, শহরের সড়কে ৬৬টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৬১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষ, পথচারীকে চাপা দেওয়া এবং অন্য যানবাহনের পেছনে ধাক্কা লাগার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ঘটেছে।
সকালের সময়েই দুর্ঘটনা বেশি
সময়ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দিনের শুরুতেই দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ২৯ শতাংশ ঘটেছে সকালবেলায়। অন্যদিকে রাতের বেলায় ঘটেছে প্রায় ১৯ শতাংশ দুর্ঘটনা।
ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ প্রাণহানি
বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩৩টি দুর্ঘটনায় ১২৫ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৯টি দুর্ঘটনায় ৮০ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ৫২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫০ জন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে, যেখানে ২৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৪ জন।
রাজধানী ঢাকাতেই জুলাই মাসে ৩৪টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
কেন বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা?
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো
অদক্ষ ও প্রশিক্ষণহীন চালক
ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন
সড়কের অবকাঠামোগত দুর্বলতা
দীর্ঘ সময় ধরে চালকদের দায়িত্ব পালন
মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল
তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানো
ট্রাফিক আইন অমান্য করা
দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
নিরাপদ সড়কের জন্য ১২ দফা সুপারিশ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সরকারের প্রতি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে অপসারণ, রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা, চালকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, উন্নত অবকাঠামো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, কার্যকর পরিবর্তনের জন্য সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
