চড়া সুদে দাদন ব্যবসা, চেক ডিজঅনারের মামলা এবং মানবপাচার ও প্রতারণার নানা অভিযোগে আলোচিত কুড়িগ্রামের উলিপুরের মমিনুল ইসলাম বাবলু রংপুরে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টার দিকে রংপুর নগরীর পশ্চিম জুম্মাপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানা ও গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যৌথ দল। প্রতারণার একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বাবলু উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের পশ্চিম কালুডাঙ্গা গ্রামের তাজুল ইসলামের ছেলে।
বাবলুর গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উলিপুরে স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশ করেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ স্থানীয় লোকজন। শনিবার (৩১ অক্টোবর) শত শত মানুষ আনন্দ মিছিল বের করেন। বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করা হয় মিষ্টি। একই দিন দুপুরে মসজিদুল হুদার সামনে মানববন্ধন করে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান ভুক্তভোগীরা।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওয়াদুদ আলম বলেন, প্রতারণার একটি মামলায় মমিনুল ইসলাম বাবলুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উলিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় উচ্চ সুদে টাকা ধার দেওয়ার আড়ালে নানা ধরনের হয়রানি ও প্রতারণা করে আসছিলেন বাবলু। তাঁর বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগও রয়েছে। কয়েক বছর সৌদি আরবে থাকার পর ২০২১ সালে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর নারীদের সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা এবং সেখানে তাঁদের অননুমোদিত কাজে বাধ্য করার অভিযোগ করেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানোর কথা বলে জাল ভিসার মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে।
দাদন ব্যবসার অভিযোগের বিষয়ে ভুক্তভোগীরা জানান, অভাবগ্রস্ত মানুষের আর্থিক সংকটকে পুঁজি করে চড়া সুদে টাকা ধার দিতেন বাবলু। ঋণ দেওয়ার সময় জামানত হিসেবে নেওয়া হতো ফাঁকা চেক ও ¯ট্যাম্পে স্বাক্ষর। পরে ঋণের মূল টাকা পরিশোধ করার পরও কিংবা এক-দুই মাস সুদের টাকা দিতে না পারলে ওই চেক ও ¯ট্যাম্প ব্যবহার করে প্রকৃত পাওনার চেয়ে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি টাকা দাবি করা হতো বলে অভিযোগ তাঁদের। এমনকি দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী জেলায় মামলা করে ঋণগ্রহীতাদের হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব ঘটনায় উলিপুরের অন্তত ৩০টি পরিবার আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ২০টি চেক ডিজঅনারের মামলা করেছেন বাবলু। এসব মামলায় প্রকৃত পাওনার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া মানবপাচার, প্রতারণা ও দাদন ব্যবসাসংক্রান্ত একাধিক মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। বিভিন্ন আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
আব্দুল মজিদ মন্ডল, মহন্ত বর্মন, দুলাল হোসেন, জোবেদ আলীসহ আরো অনেক ভুক্তভোগী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন তাঁরা। একাধিকবার মানববন্ধন করেছেন। সংসদ সদস্য ও কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাঁদের দুর্ভোগের অবসান হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
বাবলুর গ্রেপ্তারের খবরে ভুক্তভোগীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও তাঁরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারণা ও কথিত দাদন ব্যবসার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সাননিউজ/বান্না
