দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ৫৫ দিনে সারা দেশে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে। একই সময়ে নতুন করে শত শত মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে বয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায়।
রাজধানীতে কিছুটা সংক্রমণ কমলেও ঢাকার বাইরে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন, টিকা না নেওয়া, রোগীকে আইসোলেশনে না রাখা এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এদিকে হামে মৃত শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচি চললেও সামাজিক গুজব ও ভুল ধারণার কারণে এখনো অনেক অভিভাবক সন্তানদের টিকা দিচ্ছেন না, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে আরও চার শিশুর মারা গেছে। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও সাতজন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে রোববার (১০ মে) পর্যন্ত ৫৫ দিনে সারা দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৪০৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বুলেটিনে বলা হয়েছে, এদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ২৮২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর নতুন এ তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সারা দেশে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৩৮ জন ঢাকায় মারা গেছে; আর ৭৮ জন রাজশাহী বিভাগের। এ ছাড়া বরিশালে ২৯, চট্টগ্রামে ২৭, ময়মনসিংহে ২৬, সিলেটে ২৪, খুলনায় ১৪ ও রংপুর বিভাগে ৪ জন মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০৫ জন হাম আক্রান্ত হয়েছে; এই সময়ে এক হাজার ৫০৩ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে; তাদের মধ্যে এক১ হাজার ২৭৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৫৬ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। আর সবচেয়ে কম ৪৪ জন ভর্তি হয়েছে চট্টগ্রামে।
সারাদেশে গেল ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৪৯ হাজার ১৫৯ জন। এদের মধ্যে ছয় হাজার ৮১৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
নতুন উদ্বেগ, আক্রান্ত হচ্ছেন বয়স্করাও: ঢাকার দুই সিটিতে কমতে শুরু করেছে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতালের গত কয়েক দিনের তথ্যে দেখা গেছে এমন চিত্র। তবে বর্তমানে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে ঢাকার বাইরে। আক্রান্ত হচ্ছেন পরিবারের বয়স্ক সদস্যরাও। চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুর দেহে অন্য রোগের অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় বাড়ছে উদ্বেগ।
চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমানে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের পরিবারের অন্য শিশু আক্রান্ত হয়েছিল কিছু দিন আগে। আক্রান্ত হচ্ছেন সেসব পরিবারের বয়স্ক সদস্যরাও। সেইসঙ্গে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসটেন্স।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. আসিফ হায়দার বলেন, কোনো শিশু আক্রান্ত হলে তাকে আইসোলেট করা না হলে সবাই সেটায় সংক্রমিত হয়।
তবে কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছেন ডা. আসিফ হায়দার। তিনি জানান, এ হাসপাতালের বিগত কয়েক দিনের তথ্যে দেখা যায়, কমতে শুরু করেছে ঢাকার দুই সিটির রোগীর সংখ্যা। বাড়ছে ঢাকার বাইরের রোগী। ডা. আসিফ হায়দার বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন থেকে রোগী আসা কমেছে।
চলমান টিকা কার্যক্রমে কোনো শিশু বাদ পড়লে দ্রুত টিকা নেয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের। সেইসঙ্গে গর্ভবতী মা ও শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতের তাগিদ চিকিৎসকদের।
জানা যায়, বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বর্তমান সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচিসহ বেশ কিছু বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চলমান টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত সারা দেশে এক কোটি ৭২ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৮ জন শিশু হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ শতাংশ।
সারা দেশের প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এই কার্যক্রমের আওতায় টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট: হামে মারা যাওয়া প্রতিটি শিশুর পরিবারকে ২ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়েছে।
রোববার মানবাধিকার সংস্থা ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওসার ও মো. মাকসুদুর রহমান এ রিট আবেদন করেন।
এতে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইসিইউ, পিআইসিইউ ও প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় সুবিধাসহ বিশেষায়িত হাম চিকিৎসা ইউনিট স্থাপনের জন্য নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের আবেদন জানানো হয়েছে রিটে।
আদালতের অনুমতি নিয়ে বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশিস রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চে এ রিট আবেদন দাখিল করা হয়।
আবেদনে আরও প্রার্থনা করা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের মধ্যে সারাদেশে হাম ও জলাতঙ্কের টিকার মজুত, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে একটি হলফনামা দিতে বলার জন্যও আদালতের নির্দেশ চাওয়া হয়েছে রিটে।
আবেদনে বিবাদী হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও আইইডিসিআরের পরিচালকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এখনো সন্তানদের টিকা দিচ্ছেন না কোনো কোনো অভিভাবক: শিশুরা ঠিকমতো টিকা না পাওয়ায় দেশে আবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরিভাবে দেশব্যাপী হামের টিকা দিচ্ছে সরকার। এরপরও শিশুদের সুরক্ষায় টিকা দিতে অনীহা জানাচ্ছেন কিছু অভিভাবক। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রোববার রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকার ৫১৬ নম্বর গাজী বস্তিতে গিয়ে এমন কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। সানোয়ার হোসেন নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘আমি অনেকগুলো ভিডিও দেখছি মোবাইলে যে অনেক দিকে বাচ্চারা মারা গেছে। চিটাগাং, খুলনার ওই দিকে আরকি, অনেক বাচ্চা মারা গেছে, অনেক দিকেই দেখছি। এই জন্য আমি টিকাটা দিতে আগ্রহী না আরকি।’ এ কারণে সাত মাস বয়সী শিশুসন্তান আয়েশা মনিকে টিকা দেননি বলে জানালেন তিনি।
সানোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলা শেষ হওয়ার মুহূর্তে বাসায় আসেন তার স্ত্রী পলি আক্তার। তিনিও বলেন, সন্তান অসুস্থ হবে- এই ভয় থেকে আয়েশাকে টিকা দেননি। পলি আক্তার বলেন, ‘অনেক মাইনষে কয়, টিকা দিলে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে যায়, এ জন্য দিছি না।’
গাজী বস্তিতে প্রায় একশ পরিবার বসবাস করে। সুমাইয়া বেগম (২০) নামে আরেক অভিভাবক বলেন, টিকা দিলে সাইড ইফেক্ট (পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া) হয়, সে জন্য নিজের দেড় বছর বয়সী সন্তান ইসরাত জাহান ও ৪ বছর বয়সী ইব্রাহিমকে হামের টিকা দেননি।
ইসরাত মাঝেমধ্যে অসুস্থ থাকায় টিকা দিতে তার বাবা জাহিদ হোসেন নিষেধ করেছেন বলেও জানান সুমাইয়া আক্তার। টিকা না পাওয়া অনেক শিশু হামে আক্তান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে- এটা জানেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই নারী বলেন, ‘ভয় তো কিছুটা আছে। যেহেতু বাচ্চার বাবা না করতেছে, তাই এখন তো আর দিতে পারমু না। এখনো টিকা দিতে না করতাছে।’
শিশু আদিল হাসানের (৫) শরীরে চর্মরোগ থাকায় তাকে হামের টিকা দেননি বলে জানান শিশুটির মা হালিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘ভাবছি, টিকা দিলে যদি আবার চুলকানি বেড়ে যায়। সে জন্য আর দেওয়া হয়নি।’ হামে শিশুদের মৃত্যু দেখে কোনো ভয় কাজ করছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, তেমন ভয় নেই।’
টিকা নিয়ে তাদের এই ভুল ধারণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘টিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভুল ধারণা থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ, যে অভিভাবকেরা পত্রিকা পড়েন না, টেলিভিশন দেখেন না তাঁদের না জানাটা দোষের কিছু না। সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণকে জানানো। এই সচেতনতা তৈরির জন্য শিক্ষক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, ধর্মীয় নেতাদের দিয়ে সরকারকে প্রচারণা চালাতে হবে।’
সাননিউজ/আরএ
