গাজীপুরের কাপাসিয়ায় মা-মেয়েসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যার ঘটনায় গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক। ঘটনার পর থেকে বাড়ির কর্তা ফোরকান মিয়া পলাতক। তাকে হত্যাকাণ্ডের মূল সন্দেহভাজন হিসেবে দেখছে পুলিশ। হত্যার আগে সন্তানদের নিয়ে দোকান থেকে চকলেট ও চিপস কিনেছিলেন ফোরকান।
এদিকে নিহতদের মরদেহ বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত ময়নাতদন্ত শেষে গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়েছে এবং রোববার (১০ মে) গ্রামের বাড়িতে পাশাপাশি পাঁচটি কবরে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, আটক করা হয়েছে দুজনকে।
পাশাপাশি পাঁচ কবরে চিরনিদ্রায় মা, তিন মেয়েসহ পাঁচজন, গ্রামজুড়ে শোক: কাপাসিয়ায় হত্যাকাণ্ডের শিকার মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। রোববার বেলা ১১টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। এ ঘটনার পর গ্রামজুড়ে শোক চলছে।
হত্যাকাণ্ডের রাতে সন্তানদের নিয়ে দোকান থেকে চকলেট, চিপস কিনেছিলেন বাবা: রাউৎকোনা গ্রামে যে বাড়ি থেকে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই সুনসান বাড়িটি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে ওই রাতে সন্তানদের নিয়ে ফোরকান দুই সন্তান নিয়ে বাসার পাশের একটি দোকানে গিয়ে চিপস, চকলেট কিনেছিলেন।
যে বাড়িতে পাঁচজনকে হত্যা করা হয়েছে, সেই বাড়ির পাশেই আবদুর রশিদ নামের এক ব্যক্তির ছোট্ট একটি দোকান। সেখানে তিনি চা-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করেন। রোববার দুপুর ১২টায় তার দোকানে বসে কথা হয়। আবদুর রশিদ জানান, গত শনিবার ভোরে পাঁচজনের লাশ পাওয়া যায়। এর আগে শুক্রবার রাত আটটার দিকে ছোট মেয়ে মোসা. ফারিয়াকে কোলে নিয়ে ও উম্মে হাবিবার হাত ধরে তার দোকানে এসেছিলেন অভিযুক্ত বাবা ফোরকান মিয়া। বাচ্চাদের জন্য দোকান থেকে চকলেট, চিপস কেনেন।
আবদুর রশিদ জানান, রাত ১০টার মধ্যে তিনি দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যান। তাই এর পরে কোনো কিছু তার জানা নেই।
বেলা দেড়টার দিকে ওই বাড়িতে আসে স্থানীয় একদল শিক্ষার্থী। আশপাশের উৎসুক বাসিন্দারাও বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। স্থানীয় লোকজন জানান, রোববার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ওই বাড়িতে এসেছিলেন ফরেনসিক বিভাগের সদস্যরা। তারা সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে চলে গেছেন।
মৃতদেহগুলোর ময়নাতদন্ত বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত সম্পন্ন: মৃতদেহগুলোর ময়নাতদন্ত বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছে। গত শনিবার রাতে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে মরদেহগুলো গোপালগঞ্জে পাঠানোর ব্যবস্থা করে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসন তাদের এক ফেসবুক পোস্টে জানায়, সাধারণত বেলা ২টার পর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তবে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ গোপালগঞ্জে নেওয়া হবে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম থাকায় দ্রুত পচন ধরার আশঙ্কা বিবেচনায় জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শনিবারই পাঁচজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্নের ব্যবস্থা করেন। এদিকে মরদেহগুলো পিকআপে পরিবহন করা হবে জানতে পেরে সম্ভাব্য বৃষ্টির কারণে মরদেহ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গোপালগঞ্জে নেওয়ার জন্য দুটি ফ্রিজিং গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়।
এ ঘটনায় শনিবার রাতে কাপসিয়া থানায় মামলা হয়েছে। নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাত হোসেন মোল্লা বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঘটনার পরপরেই আটক করে পুলিশ। তবে তারা আটক ব্যক্তিদের নাম জানায়নি।
শনিবার সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে এক নারী, তার তিন মেয়ে ও এক ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর থেকে ওই নারীর স্বামী পলাতক। পুলিশের ধারণা, তিনি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন গোপালগঞ্জ সদরের পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাৎ হোসেন মোল্লার মেয়ে শারমিন আক্তার (৩০), শারমিনের মেয়ে মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) ও ভাই রসুল মিয়া (২২)। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়াকে (৪০) সন্দেহ করা হচ্ছে। তার বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরি গোপীনাথপুর গ্রামে। ফোরকান প্রায় পাঁচ বছর ধরে পরিবার নিয়ে কাপাসিয়ার ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ফোরকান প্রাইভেট কার চালাতেন। আর তার শ্যালক রসুল মিয়া গাজীপুর সদরের একটি কারখানায় কাজ করতেন।
সাননিউজ/আরএ
