কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি এবং মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট। শুক্রবার (৮ মে) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ড. ইউনুস সরকারের আমলে সাংবাদিকদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও আটকের নজির বিরল। তারা অবিলম্বে এসব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সংগঠনের আহ্বায়ক আকতার হোসেন বলেন, ড. ইউনুস সরকারের সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে। অনেককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি ও সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি এ দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে ধরে নিতে হবে তারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সাংবাদিকদের মুক্তি দিলে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।
মানববন্ধনে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে সংগঠনের সদস্য সচিব শেখ জামাল বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মুক্তমনা মানুষের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, মাজার, পীর-ফকির ও আউলিয়াদের সমাধিস্থল থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণকে তারা রাষ্ট্রীয় নীতির অংশে পরিণত করেছে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাংবাদিকদের ওপর চাপ, হয়রানি ও সহিংসতা চালানো হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শত শত সাংবাদিক আইনি হয়রানি, শারীরিক হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। অনেকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে এবং হাজারেরও বেশি সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। পাশাপাশি সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডেও মদদ দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।
শেখ জামাল বলেন, অতীতেও সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তবে ইউনূস সরকারের আমলে নির্যাতনের ধরন আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তিনি অভিযোগ করেন, এ সময়ে মব সহিংসতাকে উস্কে দেওয়া হয়েছে এবং টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্র অফিসে আগুন দিয়ে সাংবাদিকদের হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দায়মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে একটি ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিক নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে শেখ জামাল জানান, শাহরিয়ার কবীর, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রুপা, শেখ জামাল, মঞ্জুরুল আলম পান্না ও আনিস আলমগীরসহ সারাদেশে ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের মধ্যে কয়েকজন এখনো কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া মেহেদী হাসান, শাকিল হোসেন, তাহির জামান, এটিএম তুরাব, প্রদীপ কুমার ভৌমিক ও সোহেল আখঞ্জিসহ ১৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশন চ্যানেলের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ সারাদেশে ৪৪৯ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা এখনো বহাল রয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, টেলিভিশনের বার্তা প্রধান ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রায় এক হাজার ২০০ সংবাদদাতাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় পদও দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শেখ জামাল বলেন, বিটিভি, একাত্তর টিভি, সময় টিভি, ডিবিসি, গান বাংলা, এটিএন নিউজ, এটিএন বাংলা, মাইটিভি, বিজয় টিভি, নিউজ২৪, আমাদের অর্থনীতি, আমাদের নতুন সময়, দৈনিক মুখপাত্র, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান, বাংলা নিউজ, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া নজিরবিহীনভাবে ১৬৮ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে।
জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রেসক্লাবের প্রায় ৭০০ সদস্যের পদ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। অর্ধশতাধিক সাংবাদিকের বিদেশযাত্রায় বেআইনি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং ৪৭ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবও অবৈধভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, অভিযোগ তোলেন তিনি।
শেখ জামাল আরও বলেন, ইউনূস সরকারের আমলে সাংবাদিকদের ওপর যে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সরকার বা গোষ্ঠী এ ধরনের নির্যাতন করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ ‘নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট’ গড়ে তুলেছে।
এ সময় মানববন্ধন থেকে কয়েকটি দাবি জানানো হয়- ১. দেশের সকল সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ২. কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দিতে হবে। ৩. সাংবাদিক হত্যার বিচার করতে হবে। ৪. চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের চাকরি ফেরত দিতে হবে। ৫. ডিইউজে ও বিএফইউজে অফিস খুলে দেওয়া এবং অফিসের টাকাসহ মালামাল লুট করে আগুন দেওয়ার ঘটনার বিচার করতে হবে। ৬. জাতীয় প্রেসক্লাবসহ সারাদেশের প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সদস্যপদ ফেরত দিতে হবে। ৭. সাংবাদিকের এ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ৮. সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ প্রত্যহার করতে হবে। এবং ৯. বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের আহ্বায়ক আকতার হোসেনের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব শেখ জামালের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন- জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী, বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জে এম রউফ, ‘নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট’র যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন ইমন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) কোষাধ্যক্ষ সোহেলী চৌধুরী, আইন বিষয়ক সম্পাদক আসাদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস সোহেল, নির্বাহী সদস্য সাজেদা হক ও একেএম ওবায়দুর রহমান।
অন্যদর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাবেক অর্থ সম্পাদক রেজাউল কারীম, ডিইউজের নির্বাহী সদস্য রারজানা সুলতানা, রহিমা খানম, রমজান আলী, শফিকুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম রফিক, শফিউর রহমান, ওয়ারেসুন্নবী খন্দকার, মাজেদুল ইসলাম পাবেল, এস এম কামরুজ্জামান সাগর, শেখ ইমন আহমেদ, নাইমুর রহমান স্বপন, গাজী তুষার আহমেদ, বিউটি রানী, জয়নাল আবেদীন বাপ্পি প্রমূখ।
সাননিউজ/আরএ
