মেক্সিকো সিটি আশঙ্কাজনক হারে মাটির নিচে দেবে যাচ্ছে। স্যাটেলাইটের পাঠানো তথ্যে এ কথা জানা গেছে।
নাসা ও ইসরোর যৌথ উদ্যোগে মহাকাশে পাঠানো ‘নিসার’ নামের স্যাটেলাইট এখন পূর্ণমাত্রায় সক্রিয়। বর্তমানে মেক্সিকো সিটি ঠিক কতটা দ্রুত মাটির নীচে দেবে যাচ্ছে তা শনাক্ত করেছে নতুন স্যাটেলাইটটি।
এসব কিছুই এ মিশনের উদ্ভাবনী ‘ডুয়াল-ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড রেডার’ প্রযুক্তির কল্যাণে সম্ভব হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে মহাকাশবিষয়ক সংবাদের সাইট স্পেস ডটকম।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর যৌথ উদ্যোগে ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই ‘নিসার’ নামের এ ‘সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার’ স্যাটেলাইটটি মহাকাশে উৎক্ষেপিত হয়।
এ মিশনের মূল লক্ষ্য, পৃথিবীপৃষ্ঠের রিয়াল-টাইম বা তাৎক্ষণিক বিভিন্ন পরিবর্তন ট্র্যাক করা। ভূ-স্তর দেবে যাওয়া ও হিমবাহের পশ্চাদপসরণ থেকে শুরু করে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও দাবানলের বিস্তার এসব কিছুই এক সেন্টিমিটারের মধ্যে নিখুঁতভাবে পরিমাপ করাই এ স্যাটেলাইটের কাজ।
এক বিবৃতিতে বেলজিয়ামের ‘ফ্লেমিশ ইনস্টিটিউট ফর টেকনোলজিকাল রিসার্চ’ ও নিসার সায়েন্স দলের সদস্য ডেভিড বেকার্ট বলেন, ভূমি দেবে যাওয়ার ক্ষেত্রে মেক্সিকো সিটি সুপরিচিত এক ‘হট স্পট’ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং নিসার থেকে পাওয়া এ ধরনের ছবিগুলো এর কেবল শুরু।
১৯২৫ সাল থেকেই জানা ছিল, প্রায় দুই কোটি মানুষের আবাস্থল এ শহরের বড় একটি অংশ প্রতি বছর ১৪ ইঞ্চি বা ৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দেবে যাচ্ছে। শহরটি প্রাচীন হ্রদের তলদেশের অবশিষ্টাংশের ওপর গড়ে উঠেছে, যার নিচে রয়েছে ‘অ্যাকুইফার’ বা নরম শিলা ও বালুর ভূগর্ভস্থ স্তর।
ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও বড় শহরের ওজনের চাপে সেসব পাললিক স্তর সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে মেক্সিকো সিটির মেট্রো সিস্টেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বিভিন্ন ভবন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
এক বিবৃতিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত নাসা সদর দপ্তরের নিসার মিশনের ডেপুটি ম্যানেজার ক্রেইগ ফার্গুসন বলেন, নিসারের দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ‘এল-ব্যান্ড’ রেডারটি উপকূলীয় অঞ্চলের মতো দুর্গম ও ঘন গাছপালাপূর্ণ এলাকাগুলোতেও ভূমি দেবে যাওয়ার বিষয়টি শনাক্ত এবং ট্র্যাক করা সম্ভব করে তুলবে। বিশেষ করে যেখানে ভূমি দেবে যাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার জোরালো এবং সম্মিলিত প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, ওইসব উপকূলীয় এলাকায়।
এ পর্যন্ত মহাকাশে উৎক্ষেপিত শক্তিশালী রেডারগুলোর মধ্যে অন্যতম নিসার। এখানে ‘এল-ব্যান্ড’ বলতে এক থেকে দুই গিগাহার্টজ মাইক্রোওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ককে বোঝায়।
এ ছাড়া এ স্যাটেলাইটে একটি ‘এস-ব্যান্ড’ রেডার রয়েছে, যা দুই থেকে চার গিগাহার্টজ কম্পাঙ্কে কাজ করে। নাসা তৈরি করেছে ‘এল-ব্যান্ড’ রেডারটি, যা মাটির নিচের কঠিন শিলা ও বরফের পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল। মেক্সিকো সিটির এ গবেষণায় এ রেডারটিই ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের ইসরো তৈরি করেছে ‘এস-ব্যান্ড’ রেডার, যা গাছপালা বা বনভূমির পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারদর্শী।
এল-ব্যান্ড ও এস-ব্যান্ড উভয় রেডারই ‘সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার’। নিসার প্রতি ১২ দিনে একবার পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে। এ সময় এর গতির কারণে তা ভূমিতে প্রকৃত অ্যাপারচার বা প্রবেশপথের আকারের তুলনায় বড় এলাকা স্ক্যান করতে পারে। এ কারণেই একে ‘সিন্থেটিক’ বা কৃত্রিম অ্যাপারচার বলে।
এ রেডার থেকে পাওয়া ছবিতে যাতে কোনো ঝাপসা ভাব না থাকে সেজন্য প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার রেডার পালস বা তরঙ্গ নিক্ষেপ করা হয়।
‘নিসার’ এমন প্রথম কোনো মিশন, যা এল-ব্যান্ড ও এস-ব্যান্ড উভয় ধরনের সিন্থেটিক অ্যাপারচার বহন করছে। রেডারের বিভিন্ন প্রতিফলন নিসারের ৩৯ ফুট বা ১২ মিটার চওড়া ড্রাম-আকৃতির সংগ্রাহকের মাধ্যমে ধারণ করা হয়, যা নাসার তৈরি এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় রেডার অ্যান্টেনা রিফ্লেক্টর।
গবেষক বেকার্ট বলেন, নিসারের অনন্য সেন্সিং সক্ষমতা ও বিশ্বজুড়ে এর নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণের কারণে আমরা এখন গোটা বিশ্বের নতুন নতুন আবিষ্কারের জোয়ার দেখতে পাব।
মেক্সিকো সিটির রেডার ইমেজটি দেখতে নীল ও হলুদ রঙের এক বৈপরীত্যপূর্ণ ছোপের মতো মনে হয়। আসলে এগুলো কৃত্রিম রং, যা মাটির উচ্চতার পরিবর্তন স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
মেক্সিকো শহরের শুষ্ক মৌসুমে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে যেসব এলাকা শূন্য দশমিক পাঁচ ইঞ্চি বা দুই সেন্টিমিটারের বেশি দেবে গেছে, সেসব অংশকে নির্দেশ করছে গাঢ় নীল রংটি।
অন্যদিকে, হলুদ ও সবুজ অংশগুলো সংকেতের সামান্য ত্রুটি বা নয়েজ। নিসার মেক্সিকোর ওপর দিয়ে আরও কয়েকবার প্রদক্ষিণের পর এসব সংকেতের মান উন্নত হবে। ফলে এ অস্পষ্টতা কমে আসবে।
ক্রেইগ ফার্গুসন বলেন, এ ধরনের ছবি থেকে আমরা ধারণা পাই, নিসারের বিভিন্ন পরিমাপ আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ীই কাজ করছে।
শহরটির দেবে যাওয়ার হার উদাহরণের মাধ্যমে বোঝাতে গেলে, মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্রে পাসেও দে লা রেফোর্মাতে অবস্থিত ১১৮ ফুট উঁচু ‘অ্যাঞ্জেল অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স’ স্মৃতিস্তম্ভটির কথা বলা যায়, যেটি ১৯১০ সালে নির্মাণের পর থেকে এ পর্যন্ত এর নিচে নতুন করে ১৪টি ধাপ বা সিঁড়ি যোগ করতে হয়েছে।
‘অ্যাঞ্জেল অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স’ মেক্সিকোর স্বাধীনতার স্মারক এক স্বর্ণালি দেবদূত মূর্তিসম্বলিত স্তম্ভ।
সাননিউজ/আরএ
