ইয়েমেনে হুতি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি আরবের বিমান চলাচল খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে আগ্রহী ধনী ব্যক্তি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ব্যক্তিগত জেট ব্যবহারের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাবে আকাশছোঁয়া হয়েছে উড়োজাহাজ ভাড়ার খরচ।
বিমান পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে ব্যক্তিগত জেটের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চাহিদার তুলনায় উড়োজাহাজের সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় ভাড়ার হারও দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অর্ধেকের বেশি অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কয়েকটি আন্তর্জাতিক অপারেটর সৌদি আরবে তাদের কার্যক্রম সীমিত বা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এতে বাজারে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে এসেছে। প্রতিযোগিতা হ্রাস পাওয়ায় অবশিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক বেশি ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে রিয়াদ থেকে সরাসরি যাত্রার সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেকে বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। রাজধানী থেকে দূরে অবস্থিত বিভিন্ন বিমানবন্দর হয়ে ইউরোপ, উপসাগরীয় অঞ্চল ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যাতায়াতের চেষ্টা চলছে। ফলে এসব বিমানবন্দরে যাত্রীচাপও বেড়েছে।
বিমান চলাচল বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির পর সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্য থেকে নির্ধারিত হাজার হাজার বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস সাময়িকভাবে ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ফ্লাইটের সময়সূচি পিছিয়ে দিয়েছে। এর ফলে নিয়মিত যাত্রীদের অনেকেই বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন।
যাঁদের ব্যক্তিগত জেট ব্যবহারের সামর্থ্য নেই, তাঁদের মধ্যে অনেকে সড়কপথে প্রতিবেশী দেশ বাহরাইন কিংবা কাতারে গিয়ে সেখান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে গন্তব্যে রওনা হচ্ছেন। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাগামী যাত্রীদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি কোম্পানি সৌদি আরবে কর্মরত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে। এ উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ভাড়া ও ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে বিভিন্ন করপোরেট গ্রুপ। অনেক প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দুবাই অথবা নিজ নিজ দেশে সাময়িকভাবে স্থানান্তর করা।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ভাড়া বৃদ্ধিই নয়, যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যয় যুক্ত হওয়ায় মোট খরচ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড় আকারের উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ব্যয় কয়েক হাজার ডলার থেকে কয়েক দশ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগ তৈরি করলেও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েনি। তুলনামূলক নিরাপদ গন্তব্যগুলোতে বিমান চলাচল এখনও স্বাভাবিক রয়েছে এবং আঞ্চলিক ভ্রমণের চাহিদাও অনেকাংশে বজায় আছে। তবুও নিরাপত্তা শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তার কারণে আকাশপথে ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও ভ্রমণ খাতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
সার্বিকভাবে হুতি হামলার প্রভাব সৌদি আরবের বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইট সংকুচিত হওয়া, ব্যক্তিগত জেটের সীমিত প্রাপ্যতা এবং বাড়তি নিরাপত্তা ব্যয়ের কারণে যাত্রীদের এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ করে ভ্রমণ করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সান নিউজ / রাজীব
