আনন্দ, ভক্তি আর আবেগঘন বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। কয়েক দিনের পূজা-অর্চনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয় এবারের দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গার বিদায়কে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সৃষ্টি হয় এক আবেগময় পরিবেশ, যেখানে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের বিষণ্নতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দশমীর দিনের শুরু হয় ধর্মীয় আচার পালনের মাধ্যমে। সকালে নিয়ম অনুযায়ী দর্পণ-বিসর্জন সম্পন্ন করেন ভক্তরা। পরবর্তী সময়ে দেবীকে বরণ, প্রার্থনা এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্ধ্যার দিকে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন শুরু হয়। বিসর্জনের মুহূর্ত ঘিরে অনেক স্থানে ভক্তদের আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ দিন দেবী দুর্গা মর্ত্যধাম থেকে কৈলাসে ফিরে যান এবং আগামী বছরের শরৎকালে পুনরায় আগমন করেন।
সনাতন ধর্মমতে, বিজয়া দশমী কেবল প্রতিমা বিসর্জনের দিন নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করারও একটি বিশেষ উপলক্ষ। মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা হিংসা, ক্রোধ, লোভ ও অহংকারের মতো নেতিবাচক প্রবৃত্তি পরিহার করে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার শিক্ষাই এই দিনের মূল বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এবারের দুর্গোৎসব। পরবর্তী কয়েক দিনে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমীর নানা ধর্মীয় আচার ও পূজার মাধ্যমে ভক্তরা দেবীর আরাধনায় অংশ নেন। দেশের বিভিন্ন মণ্ডপে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। নারী, পুরুষ, শিশু ও তরুণসহ সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে উৎসব পরিণত হয় এক বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার। দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা নির্ধারিত স্থানে সমবেত হন। পরে শত শত যানবাহনে করে প্রতিমা বহন করে একটি বিশাল শোভাযাত্রা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অতিক্রম করে বিসর্জনস্থলের দিকে অগ্রসর হয়। শোভাযাত্রাজুড়ে ছিল ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধর্মীয় সঙ্গীত এবং উচ্ছ্বসিত অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি।
শহরের বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে অসংখ্য মানুষ শোভাযাত্রা উপভোগ করেন। জনসমাগমকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। বিসর্জন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নদীপথ ও স্থলপথে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করেন।
বিসর্জনের সময় ঢাকের করুণ সুর, উলুধ্বনি এবং প্রার্থনার মধ্য দিয়ে একে একে প্রতিমা জলে নিমজ্জিত করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এটি বিদায় নয়; বরং আগামী বছরে দেবীর পুনরাগমনের প্রতিশ্রুতির প্রতীক। তাই অনেকের কণ্ঠে শোনা যায়, "আসছে বছর আবার হবে"।
তবে কিছু ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে প্রতিমা সম্পূর্ণ বিসর্জনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট উপাচার বিসর্জনের রীতি অনুসরণ করা হয়। সেখানে পূজার বিভিন্ন উপাদান নির্ধারিত নিয়মে বিসর্জন দেওয়ার পর শান্তিজল সংগ্রহ করা হয়, যা ভবিষ্যৎ পূজার সঙ্গে আধ্যাত্মিকভাবে যুক্ত বলে মনে করা হয়।
এ বছর সারা দেশে কয়েক হাজার মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটিগুলোও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অধিকাংশ মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং নিরাপত্তা তদারকির বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়।
দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। আনন্দ ও আবেগমাখা বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলেও ভক্তদের হৃদয়ে রয়ে গেছে আগামী বছরের অপেক্ষা এবং শান্তি, সম্প্রীতি ও মঙ্গলময় ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
সান নিউজ / রাজীব
