তীব্র গরমে চোখের পলকে যেন রূপ বদলাচ্ছে আল্পস পর্বতমালার দেশ সুইজারল্যান্ড। নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য—মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশটির প্রায় একপঞ্চমাংশ বরফ চিরতরে হারিয়ে গেছে! বরফে ঢাকা বিশাল সব পাহাড়গুলো এখন ধূসর পাথুরে মরুভূমিতে রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি বার্ষিক মনিটরিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এর মূল কারণ ছিল—শীতকালে পর্যাপ্ত তুষারপাত না হওয়া এবং এর পরপরই গ্রীষ্মকালের চরম তাপপ্রবাহ। যদিও এটি ২০২২ সালের সর্বকালের সর্বোচ্চ বরফ গলার রেকর্ডকে সামান্যর জন্য ছাড়িয়ে যায়নি, তবুও ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশটির মোট হিমবাহের ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ বরফ উবে গেছে।
ইটিএইচ জুরিখের বিশিষ্ট হিমবাহ বিশেষজ্ঞ এবং এই প্রতিবেদনের প্রধান গবেষক ম্যাথিয়াস হুস আক্ষেপ করে বলেছেন, সাধারণ মানুষ অনেকেই টের পাচ্ছে না যে হিমবাহগুলো ঠিক কতটা দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র এক প্রজন্ম আগেও যেসব জায়গায় শত শত মিটার পুরু বরফ জমে থাকত, আজ সেখানে গেলে শুধু পাথর আর পাথরের দেখা মিলবে। তিনি সম্প্রতি এমন একটি জায়গায় গিয়ে দেখেছেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও যেখানে বিশাল বরফের আস্তরণ ছিল, এখন সেখানে কিছু টুকরো টুকরো পুরোনো বরফ গলে মিশে যাচ্ছে উত্তপ্ত পাথরের ওপর।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝাতে গিয়ে গবেষকরা জানান, হিমবাহগুলো এখন আর কেবল ওপরের তাপে গলছে না; বরং বরফের ভেতর তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ নদীর স্রোতে গহ্বর তৈরি হয়ে ভেতর থেকে ধসে পড়ছে। হুসের ভাষায়, বরফের বুকের ভেতর চিজের মতো বড় বড় গর্ত তৈরি হয়ে ছাদ ধসে পড়ছে। এই ভাঙন প্রক্রিয়া হিমবাহগুলোকে আরও দ্রুত ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও প্রকৃতির ধ্বংসলীলার কারণে ইউরোপের তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আল্পস অঞ্চলে। মেটিওসুইসের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রীষ্মের এই অর্ধবছর ছিল ১৮৬৪ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত রেকর্ড করা ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ও শুষ্ক সময়।
২০২২ সালের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বেশি থাকলেও বরফ গলার হার সামান্য কম ছিল। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ বছর সাহারার বালির আস্তরণ কম থাকায় বরফের ওপর ধূলিমলিনতা কম ছিল, যা কিছুটা হলেও সূর্যকিরণ প্রতিফলিত করতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি শীতের শেষে তুষারপাতের পরিমাণ কিছুটা বেশি ছিল।
তবে এসব সাময়িক সুরক্ষা যে হিমবাহের পতন ঠেকাতে পারছে না, তার বড় প্রমাণ প্লাটালাভাফিরন বা গ্রিজ হিমবাহ। মাত্র ২০ বছর আগেও যা একটি পুরো পাহাড়ি ঢেকে রাখত, তার ৯৯ শতাংশই এখন বিলীন হয়ে গেছে। ১৯৫০-এর দশকে এই হিমবাহটি বিশ্বের অন্যতম নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে ছিল। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে হুস বলেন, সে সময় বরফ কমার গতি একটা স্বাভাবিক সীমার মধ্যে ছিল। কিন্তু এখন আমরা যা দেখছি, তা বরফ গলার কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়; এটি হিমবাহগুলোর এক ধরনের চরম বিস্ফোরণ ও ধসে পড়ার করুণ পরিণতি।
সান নিউজ/রাজীব
