যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পর জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রপ্তানি কমানোর পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রপ্তানি কমিয়ে দিলে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমার পরিবর্তে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ডিজেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫০ ডলারে। এক ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে প্রতি লিটারে এর দাম প্রায় ২১০ টাকা। এক মাস আগে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল ৫ দশমিক ৬১ ডলার, যা প্রতি লিটারে প্রায় ১৮১ টাকার সমান।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) দৈনিক তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির উৎপাদিত ডিজেলের একটি বড় অংশ বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়াতে রপ্তানি কমানোর প্রস্তাব সামনে এসেছে।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, সম্ভাব্য স্বেচ্ছামূলক রপ্তানি সীমিত করার বিষয়ে বড় তেল শোধনাগারগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি ঘোষণা করা হয়নি। হোয়াইট হাউজও জানিয়েছে, প্রশাসন কয়েকটি বিকল্প নিয়ে পর্যালোচনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। রয়টার্স/ইপসসের আগস্টের এক জরিপে ৪৭ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ডিজেলের সরবরাহ সংকট শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শোধনাগারে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও সরবরাহ কমেছে।
রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় কয়েকটি বড় শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দেশটির কিছু এলাকায় ডিজেল উৎপাদন কমেছে, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধও রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ডিজেল মজুতও কমে আসছে। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মজুত কমে ১০৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন মজুতের পর্যায়।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রাজনীতিক মনে করছেন, সাময়িকভাবে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করা হলে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং দামও কমতে পারে।
আইওয়ার রিপাবলিকান সিনেটর চাক গ্রাসলি ও আলাস্কার রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান সাময়িক রপ্তানি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। টেনেসির কংগ্রেসম্যান টিম বারচেটও ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার বিষয়ে দুটি বিল উত্থাপন করেছেন। এর একটি প্রস্তাবে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
তবে রপ্তানি বন্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে বিশ্লেষকদের মধ্যে।
কারণ, রপ্তানি বন্ধের পর দেশের ভেতরে ডিজেলের মজুত দ্রুত বেড়ে গেলে সংরক্ষণ সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। মজুতের জায়গা পূর্ণ হয়ে গেলে শোধনাগারগুলো অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে।
উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষণেও এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল উৎপাদন দৈনিক সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল পর্যন্ত কমতে পারে।
এর প্রভাবে বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রকে পেট্রল আমদানিকারক দেশেও পরিণত হতে হতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি কমিয়ে দিলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে দেশটির ওপর নির্ভরশীল বাজারগুলো। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে। ইউরোপের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ কমে গেলে এসব দেশের ক্রেতাদের বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল সংগ্রহ করতে হবে। এতে সীমিত সরবরাহের জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে, যার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারদরেও পড়তে পারে।
উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ঘাটতি পূরণের মতো অতিরিক্ত শোধন সক্ষমতা বড় দেশগুলোর মধ্যে চীনের রয়েছে। তবে চীন সেই ঘাটতি পূরণে এগিয়ে আসবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার প্রভাব শুধু সড়ক পরিবহন বা পণ্য পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ কমে গেলে অন্যান্য জ্বালানির দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।
এয়ারলাইনস ফর আমেরিকা জানিয়েছে, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর জ্বালানি ব্যয় বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব যাত্রীদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সব ধরনের রপ্তানি বন্ধ না করে সীমিত বা স্বেচ্ছামূলকভাবে রপ্তানি কমানোর বিকল্পও বিবেচনা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ র্যাচেল জিয়েমারের মতে, এমন ব্যবস্থায় কিছু দেশের জন্য ছাড় রাখা হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে, তাদের ক্ষেত্রে রপ্তানি সীমাবদ্ধতায় ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। তবে এখনো ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বিশ্লেষকদের মূল উদ্বেগ হলো, ডিজেলের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত উল্টো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর বদলে উৎপাদন কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ডিজেলের সংকট ও দাম—দুটিই বাড়তে পারে।
সান নিউজ/ রাব্বি
