এক পাশে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, অন্য পাশে জামালপুরের মাদারগঞ্জ। মাঝখানে যমুনা নদী। নদীর দুই পাড়ের সরাসরি দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটারের মতো হলেও সড়কপথে যোগাযোগ করতে হয় সিরাজগঞ্জ ও বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে। এতে বগুড়া থেকে মাদারগঞ্জের যাত্রাপথ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার। দীর্ঘদিনের এই ঘুরপথের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে যমুনার তীরে বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনটে নতুন দুটি অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর ঘোষণার মধ্য দিয়ে।
গত ৮ জুলাই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে নদীবন্দর দুটির সীমানা নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে দেশে অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬টিতে।
নদীবন্দর দুটি কার্যকর হলে সারিয়াকান্দি থেকে সরাসরি নৌপথে জামালপুরের মাদারগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে প্রায় ২০০ কিলোমিটারের পরিবর্তে যমুনা পেরিয়ে মাত্র ১৬ কিলোমিটারের নৌপথে দুই এলাকার মানুষের যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এতে শুধু মানুষের যাতায়াত নয়, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনেও সময় ও ব্যয় কমতে পারে। পাশাপাশি যমুনার দুই পাড়ে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সারিয়াকান্দির যমুনার তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা ঘাটগুলোতে সকাল থেকেই ব্যস্ততা। কোথাও ছোট নৌকায় মানুষ পার হচ্ছে, কোথাও নদীর পাড়ে পড়ে আছে কৃষিপণ্য বোঝাই বস্তা। আবার কোথাও নৌযানে মালামাল ওঠানামার প্রস্তুতি চলছে।
নদীর ওপারেই জামালপুরের মাদারগঞ্জ। দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের যাতায়াত, আত্মীয়তা ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সহজ ও নিয়মিত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে ভৌগোলিক এই নৈকট্য বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ নিতে পারেনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারিয়াকান্দি থেকে মাদারগঞ্জের সরাসরি দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু সড়কপথে যেতে হলে সিরাজগঞ্জ হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে যেতে হয়। ফলে নদীপথে কয়েক কিলোমিটারের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ২০০ কিলোমিটারে গিয়ে ঠেকে। এতে যাত্রীদের সময়ের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. দুলাল মিঞা বলেন, নদীর দুই পাড়ে কৃষিপণ্য, নিত্যপণ্য ও অন্যান্য ব্যবসার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় পরিসরে বাণিজ্য গড়ে ওঠেনি। সারিয়াকান্দির উৎপাদিত পণ্য মাদারগঞ্জ ও জামালপুরের বাজারে সহজে পাঠানো গেলে নতুন বাজার তৈরি হবে। একইভাবে ওই অঞ্চলের পণ্যও কম সময়ে বগুড়ায় আনা সম্ভব হবে।
স্থানীয় কৃষক মো. জলিল মিয়া বলেন, বগুড়া থেকে মাদারগঞ্জ মানচিত্রে পাশাপাশি। কিন্তু মালামাল নিয়ে যেতে হলে অনেক পথ ঘুরতে হয়। এতে ভাড়া ও সময় দুটোই বাড়ে। নিয়মিত নৌযান চলাচল শুরু হলে দুই পাড়ের ব্যবসাই বাড়বে।
শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, চিকিৎসা, শিক্ষা, হাটবাজার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যও নদীর দুই পাড়ের মানুষের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নিরাপদ ও নিয়মিত নৌযোগাযোগ চালু হলে তাদের দৈনন্দিন ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. পাবেল হোসেন বলেন, নদীর ওপারেই মাদারগঞ্জ। অথচ জরুরি কোনো কাজে যেতে হলে অনেক ঘুরে যেতে হয়। নৌপথটি ঠিকভাবে চালু হলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হবে।
কৃষিপণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা
সারিয়াকান্দি ও আশপাশের এলাকায় ধান, আলু, ভুট্টা, পেঁয়াজ, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। এসব পণ্যের বড় অংশ বর্তমানে সড়কপথে বিভিন্ন মোকাম ও জেলার বাজারে পাঠানো হয়।
স্থানীয়দের মতে, নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে নৌপথে বড় পরিমাণ কৃষিপণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে কৃষকদের পরিবহন ব্যয় কমতে পারে। বিশেষ করে আলু, সবজি ও পেঁয়াজের মতো পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের ক্ষতিও কমবে।
স্কুলশিক্ষক বিপ্লব মিয়া বলেন, নদীবন্দর কার্যকর হলে কৃষিপণ্য পরিবহনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কাছের নদীবন্দরে কৃষক পণ্য নিয়ে এসে নৌযানে তুলে দিতে পারবেন। সেখান থেকে যমুনার ওপারের বাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তুলনামূলক কম খরচে পণ্য পাঠানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে শুধু নৌযান চলাচল নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। জেটি, টার্মিনাল, গুদাম, পণ্য ওঠানামা, পরিবহন, প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ, নৌযান মেরামতসহ বিভিন্ন সেবার চাহিদা তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে বাড়তে পারে হোটেল, খাবারের দোকান, ছোট ব্যবসা ও পরিবহনসেবা।
স্থানীয় কৃষক আবু তাহের বলেন, আমাদের সমস্যা শুধু উৎপাদন নয়, উৎপাদিত পণ্য কম খরচে দ্রুত বাজারে পৌঁছানোও বড় বিষয়। দূরের বাজারে পণ্য পাঠাতে পরিবহন খরচ বেশি হলে সেই ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষকের ওপর পড়ে। নৌপথে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
আরেক কৃষক রুবেল মিয়া বলেন, মৌসুমে একই সময়ে অনেক কৃষক পণ্য বাজারে তোলেন। তখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। নদীপথে দ্রুত অন্য এলাকার বাজারে পণ্য পাঠানোর সুযোগ থাকলে কৃষক এক বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকবেন না।
সারিয়াকান্দির পাশাপাশি নতুন ধুনট নদীবন্দরও উত্তরাঞ্চলের নৌযোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ধুনট নদীবন্দরের সীমানা সারিয়াকান্দি উপজেলার কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের মধুরাপাড়া ঘাট এলাকা থেকে শুরু হয়ে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার তেকুরিয়া হাটসংলগ্ন যমুনা নদী হয়ে বগুড়ার ধুনট উপজেলার চৌবার মৌজার বেশাঘীর চর পর্যন্ত বিস্তৃত। বন্দরের আওতায় চন্দনবাইশা ও শাহরাবাড়িসহ বিদ্যমান ঘাট ও খালও রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধুনটের সঙ্গে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরসহ যমুনার দুই পাড়ের বাজারগুলোর সরাসরি নৌযোগাযোগ জোরদার হলে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য মালামাল পরিবহনে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। এতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার উৎপাদিত পণ্য নৌপথে তুলনামূলক কম খরচে দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নদীবন্দর ঘোষণার খবরে স্থানীয়দের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হলেও এখন তাদের বড় প্রত্যাশা অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে। তারা দ্রুত আধুনিক জেটি, যাত্রীছাউনি, পণ্য ওঠানামার স্থান, গুদাম এবং নিরাপদ নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা চান।
নদীবন্দর ঘোষণার প্রজ্ঞাপনে সীমানা নির্ধারণের পাশাপাশি নৌপথ উন্নয়ন, জেটি নির্মাণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপন ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। দুই বন্দরের সংরক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ)।
তবে এখনো সারিয়াকান্দি ও ধুনট বন্দরে কতটি জেটি নির্মাণ করা হবে, কোন ঘাটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সম্ভাব্য ব্যয় কত এবং নির্মাণকাজ কবে শুরু হবে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীবন্দর ঘোষণার সুফল পেতে হলে শুধু কাগজে বন্দর ঘোষণা করলেই হবে না। সারা বছর নৌযান চলাচলের উপযোগী নাব্যতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে ড্রেজিং করতে হবে। পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের উপযোগী নৌযান চালুর বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
বন্দর দুটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে পণ্য ওঠানামার জন্য জেটি, গুদাম ও সংরক্ষণ সুবিধার পাশাপাশি আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ কতটা উন্নত করা যায়, তার ওপর। বিশেষ করে সারিয়াকান্দি মাদারগঞ্জ রুটে নিয়মিত নৌযান চলাচল শুরু না হলে নদীবন্দর ঘোষণার অন্যতম বড় সম্ভাবনাই পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মনিরুজ্জামান বাবু বলেন, যমুনার কারণে সারিয়াকান্দি ও মাদারগঞ্জের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। দুই এলাকার মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য ও আত্মীয়তার কারণে নিয়মিত যাতায়াত করেন। নদীবন্দর কার্যকর হলে তাদের সময় ও খরচ দুটোই কমবে। আমরা দ্রুত আধুনিক ঘাট ও জেটি নির্মাণের দাবি জানাই।
স্থানীয় মিশুক বাবু সম্রাট নামে এক ব্যক্তি বলেন, সারিয়াকান্দি ও মাদারগঞ্জ ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হলেও সরাসরি সড়ক যোগাযোগ নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দুই এলাকার মানুষকে অনেক পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হয়েছে। নদীবন্দরটি কার্যকর হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহনে এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, নদীবন্দর দুটি শুধু স্থানীয় যোগাযোগের জন্য নয়, উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সঠিক অবকাঠামো গড়ে উঠলে যমুনার দুই পাড়ের বাজারের সঙ্গে বগুড়ার সরাসরি যোগাযোগ বাড়বে। এর ফলে কৃষি ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, যমুনার দুই তীরে সারিয়াকান্দি ও ধুনটে নতুন দুটি নদীবন্দর ঘোষণা উত্তরাঞ্চলের নৌযোগাযোগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এখন এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন আধুনিক অবকাঠামো, নাব্যতা নিশ্চিতকরণ, নিয়মিত নৌযান চলাচল এবং নদীবন্দরগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগের সমন্বিত উন্নয়ন। এসব নিশ্চিত করা গেলে যমুনার দুই পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট কাটার পাশাপাশি কৃষি ও বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
