মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের আবারও ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে মিয়ানমার সরকার। দেশটির সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করার পাশাপাশি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
মিয়ানমারের এমন বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের অনাগ্রহের বিষয়টিই নতুন এই বিতর্কের মাধ্যমে সামনে এসেছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নুরুল ইসলাম বিবিসিকে বলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গারা জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি কেউই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী নয়।
তার ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয় স্বীকার করে প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সরকার কখনোই আন্তরিক সদিচ্ছা দেখায়নি। নতুন বিবৃতিও সেই অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা।
পরিস্থিতি আরও জটিল
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেশটির জান্তা সরকারের সঙ্গে লড়াই করে আরাকান আর্মি রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শুধু মিয়ানমার সরকারের অবস্থান নয়, আরাকান আর্মির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নুরুল ইসলাম বলেন, সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর সঙ্গে আরাকান আর্মির উত্থান যুক্ত হয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, ‘বাঙালি’ বিতর্কে বাংলাদেশের জড়িয়ে পড়া উচিত নয়। তার মতে, বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত—মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঠেকাতেই মিয়ানমার সরকার বিবৃতির মাধ্যমে একটি কৌশল সামনে এনেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্ভাব্য করিডর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রয়োজন। তাই নতুন বিতর্কের পেছনে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বিষয়ও থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মিয়ানমার বিষয়ক গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজের মতে, মিয়ানমার মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে চাইছে যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে না।
তার মতে, রাখাইনের বড় অংশ এখন মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে প্রত্যাবাসনের বাস্তব পরিস্থিতিও আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমার সরকারের অবস্থান সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
মিয়ানমারের বিবৃতিতে কী বলা হয়েছে?
মিয়ানমার সরকারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশে থাকা তিন লাখের কিছু বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাদের। একই সঙ্গে আরাকান থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মোট সংখ্যা নিয়ে মিয়ানমারের হিসাবের সঙ্গে বাংলাদেশের তথ্যের বড় পার্থক্য রয়েছে।
মিয়ানমারের দাবি, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের সহিংসতার আগে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে সাত লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে যায় এবং দুই লাখের বেশি সেখানে থেকে যায়। এই হিসাবের ভিত্তিতে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্যকে ভুল বলে দাবি করেছে দেশটি।
বাংলাদেশের দেওয়া প্রত্যাবাসন তালিকার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে মিয়ানমার। দেশটির দাবি, বাংলাদেশের দেওয়া আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত চার লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
মিয়ানমারের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, চার হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের অবস্থান
মিয়ানমারের এই বিবৃতির চার দিন পর ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বৈঠকে মিয়ানমারের বিবৃতির বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানানো হয় এবং ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেন, মিয়ানমারের বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয়। রোহিঙ্গাদের নিজস্ব পরিচয় রয়েছে এবং সেই পরিচয় নিয়েই তাদের মিয়ানমারে ফেরত যেতে হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে, কারণ তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে চায়। একই সঙ্গে চীনও মিয়ানমারের ওপর প্রত্যাবাসনের জন্য চাপ প্রয়োগ করবে বলে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে।
প্রত্যাবাসন বারবার আটকে গেছে
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ অবশ্য এবারই প্রথম বাধার মুখে পড়েনি। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় রোহিঙ্গাদের একটি দলকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
পরের বছর চীনের উদ্যোগেও প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হয়। তবে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হয়নি।
২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার একটি তালিকাও মিয়ানমারকে দেয়। এরপর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা হলেও প্রত্যাবাসন কার্যকরভাবে শুরু করা সম্ভব হয়নি।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ও পরের বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮৯ হাজার বলে গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও পরিচয় নিয়ে দেশটির দীর্ঘদিনের অবস্থান—সব মিলিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আগের চেয়ে আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। নতুন করে ‘বাঙালি’ বিতর্ক সামনে আনা সেই সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
সান নিউজ/ হুমায়রা
