রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশভিত্তিক শাখা একিউআইএসের গোপন সেল তৈরির চেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুই ধরনের ঘটনার এই সমান্তরাল উপস্থিতি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা নিয়ে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বাড়তি সতর্কতার জন্ম দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা বা নাশকতার আশঙ্কা নাকচ করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, সাম্প্রতিক প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং যারা আইন ভেঙে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আল-কায়েদার কার্যক্রম নিয়ে বিস্তৃত মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ভারতীয় উপমহাদেশে সংগঠনটির শাখা একিউআইএসের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংগঠনটি বড় আকারের ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কও বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, প্রতিবেদনে বাংলাদেশে একিউআইএসের গোপন সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। তবে এই দাবির বিষয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘের প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করা সম্ভব হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসে। এর মধ্যে গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় একটি তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট—সিটিটিসি।
অভিযানে নয়টি বিস্ফোরক এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধারের কথা জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই ঘটনায় ২০২৩ সালে নব্য জেএমবিতে যুক্ত হওয়া মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইমরানের সঙ্গে নব্য জেএমবির পরিচিত বোমা বিশেষজ্ঞ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুনের’ সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা উদ্ধার এবং বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তেও মামুনের নাম সামনে এসেছে।
এর আগে গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর ডেমরার পশ্চিম বক্সনগর নিঝুমবাগ সানারপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে দুটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এসব বস্তুর সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে সিটিটিসির বোম ডিসপোজাল ইউনিট।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে জুয়েল নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বোমাসদৃশ দুটি বস্তু নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। তবে জুয়েলের কোনো সাংগঠনিক পরিচয় বা বৃহত্তর কোনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তখনও তদন্তাধীন ছিল।
রাজধানী ও আশপাশে সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়—এর আগে বিভিন্ন স্থান থেকেও বোমা উদ্ধারের খবর এসেছে।
গত ৩০ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি দোকানে পড়ে থাকা ট্রাভেল ব্যাগ থেকে বিশেষভাবে তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২৪ জুলাই মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে শক্তিশালী বোমা উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।
ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কায় দেশজুড়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও সিটিটিসির নেতৃত্ব থেকে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা করা হচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে।
সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হকের বক্তব্য, দেশে এই মুহূর্তে বড় কোনো জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার আশঙ্কা নেই। প্রতিটি ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে, আল-কায়েদা বাংলাদেশে গোপন সেল গঠনের চেষ্টা করছে—জাতিসংঘের প্রতিবেদনের এই দাবির বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা সরাসরি কোনো অবস্থান জানাননি। বিষয়টি সরকার দেখবে বলেই মন্তব্য করেছেন সিটিটিসি প্রধান।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইনও জানান, জাতিসংঘের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব হবে। তবে যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বড় ধরনের হামলা না ঘটলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে একেবারে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সাবেক আইজিপি নুরুল হুদার মতে, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্যের ঘাটতি থাকলেও সেটিকে অমূলক ধরে নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই।
তার মতে, গোয়েন্দা নজরদারি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি উগ্রবাদবিরোধী কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন। পুলিশের বিশেষায়িত জঙ্গিবাদবিরোধী ইউনিটগুলোর সক্ষমতা ও কার্যক্রম বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, গ্রেপ্তার, বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার এবং বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো উগ্রবাদী তৎপরতার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই ধরনের উদ্দেশ্য রয়েছে—এমন ধারণা করাও ঠিক হবে না।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক স্বার্থে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডকে ব্যবহার বা ব্যাখ্যা করার অভিযোগ উঠেছে। তাই কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া সরাসরি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী না করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ড. তৌহিদুল হকের মতে, নিরপেক্ষ ও সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমেই ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য বের করা সম্ভব। কারণ প্রমাণের ঘাটতি রেখে কাউকে দায়ী করলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদাও মনে করেন, সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলো নিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়। তবে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে উগ্রবাদীদের ব্যবহার করছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়ার ক্ষেত্রে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ। ওই দিন দেশের প্রায় সব জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ—জেএমবি নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়।
তৎকালীন তথ্য অনুযায়ী, মুন্সিগঞ্জ ছাড়া দেশের ৬৩টি জেলার প্রায় ৫০০ স্থানে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। এতে দুজন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। পরে এসব ঘটনায় দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মামলা হয় এবং বহু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কোনো ঘটনার পর অভিযান পরিচালনা নয়, সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক, অর্থায়ন, যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক তৎপরতার ওপরও নজর রাখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো বাস্তব যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটি প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষ করে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠে আসার পর আন্তর্জাতিক তথ্য ও দেশের মাঠপর্যায়ের তদন্ত—দুই দিকের তথ্যই সমন্বয় করে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা দেখছে না। তবে একের পর এক বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা এবং বাংলাদেশে আল-কায়েদার গোপন সেল গঠনের বিষয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ—দুটিকে পাশাপাশি রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত জোরদার করাই নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের প্রধান পরামর্শ।
সান নিউজ/ জামান
