বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা নতুন করে জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন এবং মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, দায়িত্ব পালনে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে না পারা কয়েকজন মন্ত্রীকে নিয়ে সরকারের ভেতরে মূল্যায়ন চলছে। একই সঙ্গে কয়েকজনের বক্তব্য ও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য পুনর্গঠনে কয়েকজন বর্তমান মন্ত্রীর দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন মুখ কারা হতে পারেন
মন্ত্রিসভায় নতুন করে কারা জায়গা পেতে পারেন, তা নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরে বিভিন্ন নাম আলোচনায় রয়েছে। সূত্রের দাবি, দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা এবং মিত্র রাজনৈতিক দলের দু-একজন নেতাকে নতুন করে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে মিত্র দলের সংসদ সদস্য ও বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপনের নাম উল্লেখযোগ্য। টেকনোক্র্যাট কোটায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমানকে মন্ত্রী করার সম্ভাবনা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নামও সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের আলোচনায় এসেছে। সংসদের হুইপদের মধ্য থেকেও একাধিক ব্যক্তিকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের আলোচনা
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রীর পদটি শূন্য রয়েছে। এ অবস্থায় একজন অভিজ্ঞ মন্ত্রীকে মন্ত্রণালয়টির দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এমনটি হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নতুন কাউকে আনার প্রয়োজন হবে। সে ক্ষেত্রে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নামও আলোচনায় রয়েছে।
তবে নিজের নাম নিয়ে চলমান আলোচনা সম্পর্কে শহীদউদ্দীন চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার পরিবর্তন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে যে খবর ছড়িয়েছে, তা তাকে বিব্রত করেছে।
ভালো পারফরম্যান্স করা প্রতিমন্ত্রীরা পেতে পারেন বড় দায়িত্ব
মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই নয়, দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রীদের মধ্য থেকেও কয়েকজনকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার আলোচনা রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যের ভাষ্য, বর্তমানে কয়েকজন মন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করায় তাদের ওপর কাজের চাপ বেশি। বিপরীতে কিছু প্রতিমন্ত্রী তুলনামূলকভাবে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন হলে তাদের কাউকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
এ ছাড়া বিএনপি ও সমমনা দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য বা নেতাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
‘বঞ্চিত’ নেতাদের নিয়েও আলোচনা
মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়া বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও সম্ভাব্য পুনর্গঠনের দিকে নজর রাখছেন। বিশেষ করে বিগত সরকারের সময়ে মামলা, হামলা ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েও যারা প্রত্যাশিত রাজনৈতিক মূল্যায়ন পাননি, তাদের কয়েকজনের নাম নিয়ে আলোচনা চলছে।
এই তালিকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর
মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন নিয়ে দলের নেতাদের মধ্যে নানা আলোচনা থাকলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, সংসদের হুইপ এবং কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছিল।
এ কারণে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের আগে এবারও বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনা হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাও নজরে
এদিকে ঢাকার একজন মন্ত্রী এবং উত্তরাঞ্চলের দুজন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনে তাদের অবস্থান কী হবে, তা নিয়েও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়লেও কারা বাদ পড়ছেন, কারা নতুন করে দায়িত্ব পাচ্ছেন কিংবা কোন মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসছে—এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে মন্ত্রিসভার নতুন চিত্র।
