আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং বহিরাগত প্রবেশের অভিযোগকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত তিন দিনে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের দাবি অনুযায়ী দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি এবং দুই সংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও ভাঙচুর ও চিকিৎসাধীনদের ওপর হামলার অভিযোগও পাওয়া গেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ ঘটনায় উভয় সংগঠনই একে অপরকে দায়ী করেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের (জকসু) প্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৭০ জন আহত হন বলে জানা গেছে। সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টার এবং পাশের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে।
একই সময়ে রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং সরকারি বাঙলা কলেজেও উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কবি নজরুল সরকারি কলেজে অন্তত পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ঢাকা কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ছাত্রশিবিরের আলোচনা সভার প্রস্তুতিকালে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২৭ জন আহত হয়েছেন বলে উভয় পক্ষ দাবি করেছে। সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান নিতে দেখা যায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের। একই সময় নিউ মার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।
সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে অধ্যক্ষসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। পরে কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর ও শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায়ও দুই সংগঠন একে অপরকে দায়ী করেছে।
সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটে ছাত্রশিবিরের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে হল থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রদলের দাবি, নাশকতার পরিকল্পনার তথ্যের ভিত্তিতে তারা অভিযান চালিয়েছে। তবে ছাত্রশিবির অভিযোগ করেছে, বিনা উসকানিতে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন। ঘটনার পরদিন উভয় সংগঠন পৃথক কর্মসূচি পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ঘটনায় তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে।
বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মারধর করে ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই দিনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি র্যালিকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হন। বহিরাগতদের অংশগ্রহণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ পরে সহিংসতায় রূপ নেয়।
সরকারি তিতুমীর কলেজে একটি কর্মসূচিতে ছাত্রশক্তির দুই নেতাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ১৫ থেকে ২০ জন আহত হন বলে জানা গেছে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, কমিটি গঠন, হলের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা বাড়ছে। এসব ঘটনায় দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশিশক্তি ও সহিংস রাজনীতির অবসান, অস্ত্রধারীদের দ্রুত শনাক্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সান নিউজ/ হুমায়রা
