দীর্ঘদিন ধরে অবসর ভাতার জন্য অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির খবর এসেছে। সরকারের বিশেষ বরাদ্দের আওতায় প্রথম ধাপে ৩ হাজার ৯১৭ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে প্রায় ৫১৯ কোটি টাকা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী জুলাই মাস থেকেই অর্থ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২২ সালের প্রথম ছয় মাসের আবেদনকারীরা পাচ্ছেন সুবিধা
অবসর সুবিধা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জমা হওয়া ৩ হাজার ৭৫৭টি আবেদন যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি মানবিক বিবেচনায় মৃত্যুবরণ করা আরও ১৬০ জন শিক্ষক-কর্মচারীর পরিবারকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে মোট ৩ হাজার ৯১৭ জনকে প্রথম ধাপে অবসর ভাতা দেওয়া হবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা হওয়া সব আবেদন ইতোমধ্যেই নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এখন ধাপে ধাপে ২০২২ সালের বাকি আবেদনগুলোও নিষ্পত্তির প্রস্তুতি চলছে।
এখনো বিশাল আবেদনজট
যদিও নতুন এই উদ্যোগে বহু শিক্ষক উপকৃত হবেন, তবুও অবসর ভাতা কার্যক্রমে বড় ধরনের আবেদনজট এখনো রয়ে গেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এসব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা।
এছাড়া শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টেও প্রায় ৪৪ হাজার আবেদন এখনো ঝুলে রয়েছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
৭০০ কোটি টাকার তহবিল আটকে থাকায় সংকট
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্বে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে বিনিয়োগ করা শিক্ষকদের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে রাখা এই অর্থ আদায়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় অবসর সুবিধা বোর্ডের তহবিলে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
ফলে নির্ধারিত সময়ে অবসর ভাতা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন আবেদন যুক্ত হয়ে অপেক্ষার তালিকা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত সমস্যাও বাড়িয়েছে ভোগান্তি
অর্থসংকটের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সমস্যাও কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে। বোর্ডের ব্যবহৃত পুরোনো সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকার না থাকায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য কর্মকর্তারা এখন হাতে-কলমে প্রতিটি আবেদন যাচাই করছেন, যা পুরো প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দীর্ঘ অপেক্ষা
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বোর্ডের কার্যালয়ে এসে নিজেদের আবেদন সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। অনেকেই চিকিৎসা, পারিবারিক ব্যয় কিংবা জীবনের শেষ সময়ে আর্থিক নিরাপত্তার জন্য এই অর্থের ওপর নির্ভরশীল।
রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো ভাতা পাননি। অসুস্থ শরীর নিয়ে একাধিকবার রাজধানীতে এসে শুধু অপেক্ষার বার্তাই শুনে ফিরতে হয়েছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।
নতুন পরিচালনা পরিষদের রোডম্যাপ
সম্প্রতি গঠিত নতুন পরিচালনা পরিষদ অবসর সুবিধা কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেছে। বোর্ড জানিয়েছে, শুধু বিশেষ বরাদ্দ নয়, ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে সব আবেদন নিষ্পত্তির জন্য একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ অনুসরণ করা হবে।
একই সঙ্গে তথ্যভাণ্ডার আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ে অবশিষ্ট আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা, আটকে থাকা বিনিয়োগের অর্থ উদ্ধার এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে দীর্ঘদিনের এই সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
