সাভার পৌরসভার জামসিং জয়পাড়া মহল্লায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান একটি উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। পৌরসভার প্রকৌশলীদের ঘুষ দেওয়ার কথা বলে শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার কোভিড-১৯ প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (এলজিসিআরআরপি) এর আওতায় জামসিং জয়পাড়া এলাকায় প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ টাকার দুটি উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬০ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ে ৮০০ মিটার ইউনিব্লক সড়ক এবং ৬৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪০ টাকা ব্যয়ে ৩৫০ মিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। পুরো প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শুরুর পর একটি চক্র এলাকায় প্রচার চালায় যে পৌরসভার প্রকৌশলীদের ‘ম্যানেজ’ না করলে ড্রেন নির্মাণ করা হবে না। এমনকি স্থানীয় একটি মসজিদের মাইক ব্যবহার করে এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে বাড়ির অবস্থান ও আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় পরিবারপ্রতি ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
বাইতুল মামুর কেরামাতীয়া জামে মসজিদের ইমাম নাজির আহমেদ বলেন, স্থানীয় দুই ব্যক্তি তাকে মাইকিং করতে বলেছিলেন। তাদের অনুরোধেই তিনি ঘোষণা দেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, মসজিদের সেক্রেটারি খন্দকার ফরহাদ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ হাজী মো. শামসুদ্দিন, তার ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স এবং স্থানীয় কয়েকজনের নেতৃত্বে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এভাবে শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল টাকা না দিলে বাড়ির সামনে ড্রেন হবে না। ভয় পেয়ে ধারদেনা করে টাকা দিয়েছি। পরে জানতে পারি পুরো প্রকল্পই বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, ‘ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রকৌশলীদের টাকা দিতে হবে বলে আমাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এখন শুনছি কাজগুলো সরকারি প্রকল্পের আওতায় হচ্ছে।’
একই অভিযোগ করেছেন গৃহবধূ মুন্নি আক্তার, স্কুলশিক্ষিকা নাসিমা আক্তার, আকলিমা আক্তারসহ আরও অনেক বাসিন্দা। তারা দাবি করেন, ড্রেন নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই জেনেও তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে।
সাভার পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) তৌফিক ইমাম রূপক বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ দুটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এলাকাবাসীর কাছ থেকে টাকা তুলে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। যারা টাকা নিয়েছে তারা অপরাধ করেছে।’
পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, ‘এলজিসিআরআরপি প্রকল্পের কোনো কাজেই স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিধান নেই। প্রকৌশলীদের নাম ব্যবহার করে কেউ অর্থ আদায় করলে তার দায় পৌরসভা নেবে না।’
অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে স্থান ত্যাগ করেন। অপরদিকে হাজী মো. শামসুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে শামসুদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ হাসান প্রিন্স এবং স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন টাকা তোলার বিষয়টি স্বীকার করেন। তাদের দাবি, ড্রেন নির্মাণের জন্য টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সেই টাকা কাকে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তারা কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
এদিকে পুরো বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরতের দাবি জানিয়েছেন জয়পাড়া মহল্লার সচেতন বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, সরকারি ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।
