দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসক মমতা বন্দ্যোপধ্যায়কে ভোটের লড়াইয়ে ধরাশায়ী করা শুভেন্দু অধিকারী আলোচনায় এগিয়ে ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাকেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিল ভারতের শাসক দল বিজেপি।
বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী দলের ২০৭ জন জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে শুক্রবার (৮ মে) বৈঠক করে শুভেন্দুকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা ঘোষণা করেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিজেপি নেতা অমিত শাহ। নিয়ম অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের পরিষদীয় দলনেতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন।
শনিবার (৯ মে) কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নতুন সরকার শপথ নেবে। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
আনন্দবাজার লিখেছে, মুখ্যমন্ত্রী যে শুভেন্দুই হচ্ছেন, তা নিয়ে খুব একটা সংশয় ছিল না পদ্ম (বিজেপির নির্বাচনী প্রতিক) শিবিরে। ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর পদে তাকেই সবচেয়ে জোরালো দাবিদার বলে মনে করা হচ্ছিল।
তবে শুভেন্দু ছাড়াও বিজেপির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিত স্বপন দাশগুপ্ত, দলের রাজ্য সভাপতি শমীক দাশগুপ্ত, নারী নেত্রী অগ্নিমিত্রা পালসহ আরও কয়েকজনের নাম আসছিল আলোচনায়। সবাইকে পেছনে ফেলে ৫৫ বছর বয়সী শুভেন্দুই রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হতে চলেছেন।
ভারতের যে কোনো রাজ্যে নির্বাচনের পর বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা বাছাইয়ের সময় কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের সেই রাজ্যে পাঠায় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রধান পর্যবেক্ষক করা হয়েছিল অমিত শাহকে। তার সঙ্গে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি। তাদের তত্ত্বাবধানে শুক্রবার বিকেলে কলকাতার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে নির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠক হয়।
বিধায়কদলের সঙ্গে বৈঠকের পর অমিত শাহ বলেন, পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আটটি প্রস্তাব এসেছিল। সব প্রস্তাবে একটিই নাম ছিল। দ্বিতীয় নামের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো দ্বিতীয় নাম আসেনি। তাই শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করছি।
গত পাঁচ বছর ধরে বিধানসভায় প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীই ছিলেন রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপির আন্দোলন সংগ্রামের প্রধান মুখ। রাজ্যে সন্ত্রাস, ‘অনুপ্রবেশ’, অবৈধ অভিবাসী, দুর্নীতিসহ নানা ইস্যুতে ‘ঝাঁঝালো’ মন্তব্য করে বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন তিনি।
গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু প্রার্থী হয়েছিলেন ২০০৭ সালে কৃষক ‘বিদ্রোহের’ জন্য বিখ্যাত নন্দীগ্রাম ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে। দুটি আসনেই জিতেছেন তিনি। ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত হেভিওয়েট প্রার্থীকে হারিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি ভোটে।
এর আগেও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু নিজের কেন্দ্র নন্দীগ্রাম থেকে মমতার বিরুদ্ধে লড়ে জিতেছিলেনেএক হাজার ৯৫৬ ভোটে। অর্থাৎ, পরপর দুইবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নির্বাচনে হারিয়ে শুভেন্দু নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করেন।
অথচ শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর আগে। তার আগে তিনি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আস্থাভাজন’ ছিলেন। ২০২০ সালের শেষদিকে তিনি তৃণমূল ও মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেন।
বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলছে, তৃণমূলে থাকা ও মমতার আস্থাভাজন হওয়ার কারণেই মনে করা হত বিজেপির পুরনো নেতাদের কাছে শুভেন্দুর গ্রহণযোগ্যতা কম।
তা ছাড়া শুভেন্দু অধিকারী পুরনো কংগ্রেসি ঘরানার রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান এবং বিজেপি ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে তার কোনো পুরনো সম্পর্কও ছিল না।
আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, নির্বাচনে শুভেন্দুর বড় সাফল্যের পরও বিজেপি সরকারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে জল্পনা ছিল। তার একটি কারণ অবশ্যই দলটির ইতিহাস।
‘অতীতে অনেক রাজ্যেই সরকার গঠন করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণায় চমকে দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। এমন কাউকে শাসকদলের পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচন করা হয়েছে, যার কথা কেউ ভাবেননি। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু করা হবে কি না, জল্পনা ছিল।’
‘তবে একাংশের মতে, অন্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে খুব বেশি চমক দেওয়ার সুযোগ ছিল না। মমতাকে ভবানীপুরে হারিয়ে শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী পদে নিজের দাবি অনেক জোরদার করে ফেলেছিলেন। তা উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। করলে দলের অন্দরেই একটি অংশে ক্ষোভ তৈরি হতে পারত। নির্বাচনে এত বড় জয়ের পর সেই ঝুঁকি আর নেননি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।’
শুভেন্দু অধিকারীকে বিজেপি নেতৃত্ব মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য নির্বাচিত করলেও এবার সরকারে কেউ উপ-মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন কিনা তা জানানো হয়নি। গত দুই দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে কোন উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিল না। সর্বশেষ জ্যোতি বসুর বামপন্থি সরকারে প্রয়াত সিপিএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য উপ-মুখ্যমন্ত্রীর পদে ছিলেন।
এনডিটিভি লিখেছে, এবার রাজ্যে দুজন উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে একজন সম্ভবত একজন নারী নেত্রী। সাম্প্রতিক নির্বাচনে আসানসোল দক্ষিণ থেকে জয়ী বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এই দৌড়ে এগিয়ে আছেন বলে জানা গেছে। তিনিই রাজ্যের প্রথম নারী উপ-মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন।
এ ছাড়া দ্বিতীয় উপ-মুখ্যমন্ত্রী উত্তরবঙ্গ থেকে হতে পারেন। এমন জল্পনা চলছে যে শিলিগুড়ি থেকে বিজয়ী প্রার্থী শঙ্কর ঘোষকে এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টির ভোটের ফল জানা গেছে গত ৪ মে। এর মধ্যে ২০৭টিতে জিতে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
তৃণমূল ৮০টি আসনে জিতেছে এবং ছয়টি আসন পেয়েছে বাম, কংগ্রেস ও অন্যান্য দলগুলো। রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রে মে ২১ পুনর্নির্বাচন হবে।
সাননিউজ/আরএ
