স্বপ্নের দেশ ইতালি। মাদারীপুর থেকে প্রতি বছর ইতালি যাওয়ার পথে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য তরুণ-যুবক। বন্দী হচ্ছে মাফিয়াদের হাতে। লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে দিতে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবারগুলো। কখনও প্রাণ হাতে নিয়ে দেশে ফিরতে পারছে আবার কখনও আসছে শুধু লাশ। কারও আবার কোন খোঁজই পাওয়া যায় না আর।
উপজেলার প্রান্তিক পর্যায়ে অসংখ্য তরুণ ইতালি যাওয়ার জন্য দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে বন্দি রয়েছে লিবিয়াতে। এসকল তরুণের পরিবার নিজের সন্তানকে বাঁচাতে বিক্রি করে দিচ্ছেন ফসলি জমি, উপায় না পেয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে থাকার আশ্রয় বাড়িটুকুও। সহায়-সম্পদ বিক্রি, আত্মীয়- স্বজনদের কাছ থেকে ধার-দেনা, এনজিও থেকে ঋণ তুলে মোটা অংকের টাকা তুলে দিচ্ছেন দালালের হাতে! কখনও সন্তান পৌছাতে পারছে ইতালি, আবার কখনও মাফিয়ার বন্দীদশা থেকে মিলছে মুক্তি, ফিরছেন বাড়িতে আবার কারও কোন খোঁজও মিলছে না আর!
মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বেশ কয়েকটি পরিবারের এমন খবর জানা গেছে। তবে এসকল পরিবারের বেশির ভাগই তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন!
শিবচরের বাঁশকান্দি ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের মুন্সীকান্দি গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমানের ছেলে মেহেদী হাসান ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন। স্থানীয় সাগর ও আবু তালেব নামের দুই দালালের সাথে ২২ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া পৌছে সে। লিবিয়া পৌছানোর তিন মাস পর মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয় তাকে। ১৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়ানোর ১০ দিন পর আবারও মাফিয়ারা জিম্মি করে তাকে। গত তিন মাস ধরে বন্দী। এখন মুক্তিপণ চাচ্ছে ২০ লাখ। অথচ, ৩৯ লাখ টাকা যোগাতে এই পরিবারের জায়গা-জমি বিক্রি করতে হয়েছে। বসত বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা জোগার করেছেন। ১২ শতাংশ জমিও লিখে নিয়েছে দালাল আবু তালেব।
মেহেদীর বাবা আব্দুর রহমান বলেন,' ২২ লাখ টাকা চুক্তিতে ছেলেকে বিদেশ পাঠাই। লিবিয়া নেয়ার পর সাগরই মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয় আমার ছেলেকে। তখন, ধার-দেনা কইরা টাকা দিছি। আমার একটা কলার বাগান ছিল। ওইটা 'পাওয়ার দলিল' কইরা নেয় সাগর। মাফিয়ার কাছ থেকে ছাড়ানোর পর গত তিন মাস আগে আবারও মেহেদীরে বিক্রি কইরা দিছে। এখন ২০ লাখ টাকা চায়! প্রতিদিন মারধর করে।'
উপজেলার ভান্ডারীকান্দি ইউনিয়নের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লিমন ইসলাম(১৮)। গত ১৪ জুন শেষ কথা হয় পরিবারের সাথে। এরপর আর যোগাযোগ নেই।
২৫ লাখ টাকা চুক্তিতে ২৩ লাখ টাকা নগদ দিয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে চলতি বছরের ৪ এপ্রিল ঘর ছাড়ে লিমন। ২ মাস লিবিয়ায় দালালের বাসায় থাকলেও গত ৪ মাস ধরে নিখোঁজ লিমন। সন্তানের খোঁজ না পেয়ে অসহায় মায়ের আহাজারি শুধু নিত্য সঙ্গী!
অন্যদিকে, উপজেলার নিলখী ইউনিয়নের বাগমারা এলাকা ঘুরে লিবিয়ায় মাফিয়াদের হাতে বন্দী এবং নিখোঁজ তরুণদের বেশ কয়েকটি পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেছে। যারা নিজেদের সহায়-সম্বল বিক্রি করে সন্তানদের মুক্তির জন্য টাকা পাঠাচ্ছেন দালালের মাধ্যমে সূদুর লিবিয়াতে। এসকল পরিবারের সন্তানদের নির্যাতনের চিত্র ভিডিও কলে দেখিয়ে টাকা আদায় করছে চক্রটি। মাফিয়াদের হাত থেকে বাঁচাতে ফসলি জমি ছাড়াও নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন ভিটে-বাড়িও। লাখ লাখ টাকা দিয়েও অনিশ্চয়তায় থাকা এসব পরিবার গনমাধ্যমে তথ্য দিতেও অপারগতা প্রকাশ করছেন। রাখছেন গোপনও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের ২২ তারিখ দালালের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ে নিলখীর বাগমারা এলাকার নসিমন চালক কাবুল মাতুব্বরের ছেলে জাকির হোসেন(১৯)। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব, মিশর ঘুরিয়ে প্রায় ২ মাস পর লিবিয়া পৌছায় জাকির। সেখানে ৯ মাস অবস্থানের পর গত ৮ আগস্ট শনিবার 'গেম' দেয় দালালচক্র। শনিবার মধ্যরাতে ট্রলারের করে রওনা হবার আগে সকালে দালালকে আরও ২ লাখ টাকা দেয় জাকির হোসেন এর বাবা। বোটে উঠার আগে বাড়িতে ভয়েস ম্যাসেজ পাঠায় জাকির হোসেন। মায়ের সাথে 'ইতালি গিয়ে কথা হবে'__ এই ছিল তার শেষ কথা।
এরপর ইতালি অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে বোটটি ডুবে যায় সাগরে! বোট ডুবিতে ২৯ জন নিখোঁজ হন। তাদের মধ্যে জাকির হোসেন একজন। এখনও তার খোঁজ মিলেনি। আশা ছেড়ে দিয়েছেন পরিবারও। এদিকে দালালকে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেয় নিখোঁজ জাকিরের পরিবার। ওই টাকা ফেরত পেতে বর্তমানে চলছে দেন-দরবার। 'যদি টাকা ফেরত না পান' এমন আশংকায় পুরো ঘটনাটি চেপে যাচ্ছেন নিখোঁজ জাকিরের পরিবার!
জাকির হোসেনের বাবা কাবুল মাতুব্বর বলেন,'ধার-দেনা করে ছেলেকে পাঠিয়েছিলাম। নৌকা ডুবিতে ছেলে নিখোঁজ রয়েছে। দালাল বলতেছে খোঁজাখুঁজি চলছে। এদিকে যাকে টাকা দিছি, সেই টাকা ফেরত আনার চেষ্টা করতেছি।'
একই গ্রামের সাহিল বেপারী। বিশ বছর বয়সী এই যুবক ২০২৪ সালের আগস্টের পর ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ে। লিবিয়ায় পৌছানোর দশ মাস পর মাফিয়ার হাতে আটক হয় সে। তবে তার পরিবারের দাবী স্থানীয় দালালই মূলত মাফিয়া। এটা তাদেরই কারসাজি! ইতালি পাঠানোর সময় সাহিলের পরিবার ১৮ লাখ টাকার চুক্তি করেছিল দালালের সাথে। মাফিয়ার হাতে আটকের পর ছাড়াতে ২৩ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। সেখান থেকে পরিচিত এক দালালের তত্ত্বাবধানে বর্তমানে রয়েছে সাহিল। তবে পরের দালালকে দিতে হয়েছে আরও ১৮ লাখ! সব মিলিয়ে ৫৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে সাহিলের পেছনে।
সাহিল বেপারীর বড় ভাই ইয়াসিন বলেন,'লিবিয়ায় আটকের পর মাফিয়ারা মারধর করতো। আমাদের ভিডিও কলে রেখে মারধর করতো। বাধ্য হয়েই ভাইকে বাঁচাতে টাকা দিয়েছি।'
এর পাশের বাড়ির আরেক যুবক। ১৪ মাস আগে অর্থাৎ, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে লিবিয়ায় পৌছায়। দালালের সাথে কথা ছিল লিবিয়া পৌছানোর পরেই 'গেম' দেবে। পৌছে যাবে ইতালিত। অথচ লিবিয়ায় পৌছানোর ৫ মাস পরেই আটক হয় মাফিয়াদের হাতে। এখনও বন্দী সেখানে। নির্যাতনের সময় সরাসরি ভিডিও কলে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে টাকা দাবি করে। পরিবারের আশা তাদের সন্তানকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারবে। এজন্য জায়গা জমি এবং একমাত্র থাকার ঘরসহ পুরো বাড়িই বিক্রি করতে হয়েছে তাদের। যার কাছে বিক্রি করেছেন, তার কাছ থেকে তিন বছর থাকার অনুমতি নিয়ে নিজ বাড়িতেই এখন আশ্রিত পরিবারের মতো বাস করছেন তারা!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই পরিবারের বড় মেয়ে বলেন,'আমরা বিষয়টা নিয়ে কাউকে জানাতে চাচ্ছি না। দালালের সাথে কথা চলতেছে। আশা করি ভাইকে ফিরিয়ে আনতে পারবো। জায়গা-জমি, ঘর-বাড়ি বিক্রি করে দিতে হয়েছে।'
এছাড়াও শিবচর উপজেলার সীমানাঘেঁষা জেলার ছিলারচর এলাকার যুবক তুহিন বেপারী প্রায় ৫ মাস লিবিয়ার জেলে বন্দী থাকার পর দেশে ফিরেছেন। মাফিয়ার হাতে বন্দী থাকাকালীন হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলাসহ বেদম মারধরের শিকার হন তুহিন।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান জানান,'অবৈধভাবে বিদেশ গমন ব্যক্তি, পরিবার ও দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসন জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সর্বদা সচেষ্ট আছে। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দিলে প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নেবে। তবে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার রোধে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, সামাজিক ভাবে জন সচেতনতা বৃদ্ধি খুবই জরুরী।'
সাননিউজ/বান্না
