কক্সবাজারের রামু উপজেলায় একটি অপহরণ মামলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। মামলার বাদী পক্ষের অভিযোগের বিপরীতে অভিযুক্ত দুবাই প্রবাসী আনোয়ার হোসেনের পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন, এটি মূলত পারিবারিক বিরোধের জেরে দায়ের করা হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলন্ডী ইউনিয়নের বাসিন্দা ও দুবাই প্রবাসী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে রামু উপজেলার রাজরকুল ইউনিয়নের দিয়াংপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া ছিদ্দিকা তাছমিনের ২০২৪ সালের ৮ জুলাই পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয় বলে উভয় পরিবারের একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের সময় দেনমোহর নির্ধারণসহ একটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে উভয় পক্ষের অভিভাবক ও সাক্ষীরা স্বাক্ষর করেন এবং পরবর্তীতে আইন অনুযায়ী নিবন্ধনের বিষয়টি উল্লেখ ছিল।
অভিযুক্ত পরিবারের দাবি, বিয়ের পর প্রায় দুই বছর স্বাভাবিকভাবে দাম্পত্য জীবন চলছিল। এ সময় শ্বশুরের আর্থিক প্রয়োজনের কারণে প্রবাসী আনোয়ার হোসেন কিছু অর্থ ধার দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরে আরও অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে তাদের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, ওই বিরোধের পর অপহরণের অভিযোগ এনে পুলিশকে তথ্য দেওয়া হয়। এরপর গত ১ জুলাই রাতে রামু ও কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের একটি দল চৌফলন্ডী এলাকায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট তরুণীকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে আসে।
পরবর্তীতে ৪ জুলাই তরুণীর মা মনোয়ারা আক্তার বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ছয়জনকে আসামি করে রামু থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রবাসী আনোয়ার হোসেন ছাড়াও তার পরিবারের সদস্য এবং কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, তার মেয়ে স্কুলছাত্রী এবং ২৫ জুন বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাকে অপহরণ করা হয়। এ অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মসজিদের মোয়াজ্জেম ও এলাকাবাসীর একাংশ দাবি করেছেন, অভিযুক্ত তরুণ-তরুণীর মধ্যে আগে থেকেই সামাজিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল এবং বিষয়টি এলাকার অনেকেই জানতেন। তাদের অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধের কারণে মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে।
মামলার বাদী মনোয়ারা আক্তার বলেন, স্বামীর নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার বিষয়ে এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার বাবার বাড়ির লোকজনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, তদন্তে যদি কোনো নিরীহ ব্যক্তি মামলায় জড়িয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে যাচাই করা হবে। এছাড়া কোনো মেয়ের বয়স আইন অনুযায়ী পূর্ণ না হলে তার বিয়ে বৈধ নয়। এ ধরনের ঘটনায় আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, প্রধান অভিযুক্তদের একজন বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। ভিকটিম আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন এবং আদালতের নির্দেশে তাকে মায়ের জিম্মায় রাখা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকাবাসী এবং অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হলে মামলার বাস্তব চিত্র সামনে আসবে এবং নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় চূড়ান্ত সত্যতা ও দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
