বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় সেমিনার ও দিনব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ রোববার (১১ অক্টোবর) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের অ্যালামনাই ফ্লোরে ‘ Lived Experiences to Meaningful Change: Promoting Clinical Social Work Practice in Mental Health’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ( CSWAB) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ( CSWAB)-এর সভাপতি ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. তাহমিনা আখতার। তিনি সেমিনারে মূল প্রবন্ধও উপস্থাপন করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এম শাহীন খান।
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা, ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক অংশগ্রহণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। মানুষের অর্থ-সম্পদ কিংবা বাহ্যিক সাফল্য থাকলেও মানসিক সুস্থতা ব্যাহত হলে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই একটি মানবিক ও সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সংশ্লিষ্ট নীতি প্রণয়নে সেবাগ্রহীতাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। মানসিক কষ্ট, সহায়তা পাওয়ার অভিজ্ঞতা কিংবা সেবা গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলে বিদ্যমান সেবার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা এবং সেবাকে আরও কার্যকর, সহজলভ্য ও মানবিক করা সম্ভব। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ ও নেতিবাচক ধারণা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষের অনুভূতি ও সমস্যাকে মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাঁদের কথা সহমর্মিতার সঙ্গে শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
উপাচার্য আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। কারণ, একজন মানুষের মানসিক সমস্যার সঙ্গে পারিবারিক টানাপোড়েন, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক প্রতিকূলতার মতো বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে। তাই ব্যক্তির সমস্যা বোঝার পাশাপাশি তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মের শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে কাজ শেখার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন। একই সঙ্গে ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মের পাঠ্যক্রম প্রণয়নে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা এবং পেশাগত স্বীকৃতি, নৈতিক মানদণ্ড ও সেবাগ্রহীতাদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে অবদান রাখতে এবং ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মের বিকাশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করতে আগ্রহী বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, মানসিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করা জরুরি। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি ঘটনার পেছনে থাকা পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগ কিংবা চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম। প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক সহায়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের সমন্বয়ে একটি কার্যকর সেবাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে মানসিক ও সামাজিক সংকটে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ সহায়তা প্রদান এবং তাঁদের পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
এদিকে, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতর এবং এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পায়রা চত্বরে দিনব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
ছাত্র-নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মেহ্জাবীন হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
প্রদর্শনীর মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘জীবনের অভিজ্ঞতার কণ্ঠস্বর শোনা: বাস্তব কণ্ঠ, বাস্তব পরিবর্তন’। প্রতিপাদ্যের আলোকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনা, তাঁদের প্রয়োজন অনুধাবন করা এবং সেই অনুযায়ী সেবার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাননিউজ/বান্না
