আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের ফাইনালে বিতর্কিত রেফারিংয়ের কারণে যে ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল, কয়েক মাসের ব্যবধানে বিশ্বকাপেও যেন সেই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি দেখল সেনেগাল। এবার বেলজিয়ামের বিপক্ষে নাটকীয় এক ম্যাচে শেষ মুহূর্তের ভিএআর সিদ্ধান্ত তাদের বিশ্বকাপ অভিযান থামিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়ে ম্যাচের ৮৬ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল সেনেগাল। কিন্তু এরপরই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম। প্রথমে রোমেলু লুকাকু, পরে ইউরি টিলেমানস গোল করে ইউরোপের দলটিকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন।
অতিরিক্ত সময়ে ভিএআরের সিদ্ধান্তেই বদলে যায় ম্যাচ
সমতায় থাকা অবস্থায় অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। বেলজিয়ামের একটি আক্রমণে সেনেগালের ডি-বক্সে টিলেমানস বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করলে লামিনে কামারার সঙ্গে তার সংস্পর্শ হয়। মাঠের রেফারি প্রথমে খেলায় কোনো ফাউল দেখেননি এবং বেলজিয়ামের পেনাল্টির আবেদনও প্রত্যাখ্যান করেন।
তবে ভিএআর কক্ষ থেকে অন-ফিল্ড রিভিউয়ের পরামর্শ আসে। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের রিপ্লে দেখার পর রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বেলজিয়ামের পক্ষে পেনাল্টি দেন। পুরো পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় সাত মিনিট সময় লাগে। এরপর ১২৫তম মিনিটে স্পট কিক থেকে গোল করে বেলজিয়ামকে জয় এনে দেন টিলেমানস।
কোচের হতাশা, তবে রেফারিকে নিয়ে নীরবতা
ম্যাচ শেষে সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াও রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে সরাসরি কোনো সমালোচনা করতে চাননি। তিনি বলেন, দল শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, তবে দুই গোলের লিড ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, অতিরিক্ত সময়ে বেশ কয়েকজন ফুটবলারের শারীরিক ক্লান্তি দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে।
তার ভাষায়, ফুটবলে এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
ইব্রাহিমোভিচের কড়া সমালোচনা
সুইডেনের কিংবদন্তি ফুটবলার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে মোটেও স্বাভাবিকভাবে দেখেননি। তার মতে, এটি কোনোভাবেই পেনাল্টি হওয়ার মতো ঘটনা ছিল না।
তিনি বলেন, আধুনিক ফুটবলে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা জানেন যে বক্সের ভেতরে সামান্য স্পর্শ পেলেও ভিএআরের মাধ্যমে সুবিধা আদায় করা সম্ভব। ফলে খেলাটির স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইব্রাহিমোভিচ আরও বলেন, একটি সিদ্ধান্ত যদি বোঝাতে একাধিক রিপ্লে, বিভিন্ন ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল এবং দীর্ঘ আলোচনা দরকার হয়, তাহলে সেটিকে স্পষ্ট পেনাল্টি বলা কঠিন। এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হওয়া দুঃখজনক।
আফকনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি?
ইব্রাহিমোভিচের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের ফাইনালেও সেনেগাল একই ধরনের বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছিল। তাই ধারাবাহিকভাবে বড় টুর্নামেন্টে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে প্রশ্ন তোলা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সাবেক তারকাদের সমর্থন
কানাডার সাবেক গোলরক্ষক ও ধারাভাষ্যকার ক্রেইগ ফরেস্টও মনে করেন, সেনেগালের বিপক্ষে নেওয়া সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত কঠোর ছিল। তার দাবি, আফ্রিকান কাপ অব নেশনসেও দলটির বিরুদ্ধে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গিয়েছিল।
অন্যদিকে নাইজেরিয়ার সাবেক অধিনায়ক জন ওবি মিকেল আরও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তার মতে, কোন দল খেলছে, অনেক সময় যেন তার ওপরই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা বদলে যায়। একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে এক ম্যাচে একরকম সিদ্ধান্ত, অন্য ম্যাচে আরেকরকম সিদ্ধান্ত ফুটবলের জন্য শুভ নয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, খেলাটিকে সবার জন্য সমান ও ন্যায্য রাখতে হলে নিয়মের প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নতুন করে প্রশ্নের মুখে ভিএআর
বিশ্বকাপের এই ম্যাচের পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ভিএআরের ব্যবহার এবং রেফারিংয়ের মান। প্রযুক্তির লক্ষ্য ছিল বিতর্ক কমানো, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সেনেগালের জন্য এটি কেবল একটি হার নয়; বরং টানা দুটি বড় আন্তর্জাতিক আসরে বিতর্কিত রেফারিংয়ের কারণে হতাশার আরেকটি অধ্যায় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
