একনজরে বিশেষ হাইলাইটস
ব্রাজিলে লুলার কামব্যাক: প্রথম ধাপের নির্বাচনে কিছুটা পিছিয়ে থাকার পর দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন বাম ধারার প্রবীণ নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
ভোটারদের অংশগ্রহণ: প্রথম দফার তুলনায় দ্বিতীয় ধাপে ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়াই লুলার এই নাটকীয় বিজয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
পররাষ্ট্রনীতির সমীকরণ: লুলার প্রকাশ্য ফিলিস্তিনপন্থী ও স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে জোরালো অবস্থানের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সার্বিয়ায় ভুচিসের পতন: দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র শাসক আলেকসান্দার ভুচিস বিরোধী জোটের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে নিজ দেশেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন।
তারুণ্যের জয়রথ: সার্বিয়ার নোভি সাদে রেলস্টেশনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও সরকারের চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশটির তরুণ সমাজের দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের লাগাতার সরকারবিরোধী আন্দোলনই ভুচিসের পতনের পথ প্রশস্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির মাঠে সম্প্রতি ক্ষমতার পালাবদলে দুটি বিপরীত চিত্র সামনে এসেছে, যা বিশ্ব কূটনীতির গতিপ্রকৃতি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। দক্ষিণ আমেরিকার প্রভাবশালী রাষ্ট্র ব্রাজিলে ডানপন্থীদের হটিয়ে বাম ধারার রাজনীতিতে কামব্যাক করেছেন প্রবীণ নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
অন্যদিকে, ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখা প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিস নির্বাচনী লড়াইয়ে ধরাশায়ী হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন।
ভৌগোলিক দূরত্ব এবং অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, এই দুই দেশের নির্বাচন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সমীকরণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে, যার মূল সুতোটি যেন জড়িয়ে আছে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংঘাতের সঙ্গে।
লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি ব্রাজিলে লুলার চোখ জুড়ানো রূপকথা : ব্রাজিলিয়ান রাজনীতিতে লুলা দা সিলভার প্রত্যাবর্তনকে রূপকথার গল্প বললেও কম বলা হয় না। নির্বাচনের প্রথম দফার ফলাফলে কট্টর ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীর পেছনে পড়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের চূড়ান্ত লড়াইয়ে সব হিসাব ওলটপালট করে দিয়ে চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্রপতির আসনে বসতে চলেছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফার ভোটে প্রায় নিরানব্বই শতাংশ ব্যালট গণনা শেষে লুলা অর্জন করেছেন প্রায় একান্ন দশমিক পঁচাত্তর শতাংশ ভোট। তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর পুত্র ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন আটচল্লিশ দশমিক পঁচিশ শতাংশ ভোট।
প্রাথমিক ধাক্কা সামলে এই নাটকীয় জয়ের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে ফেরানোর কৌশল। প্রথম পর্বে ভোটদানে অনীহা কিছুটা বেশি থাকলেও, দ্বিতীয় দফায় ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। রাজনৈতিক মিত্রদের মতে, সাধারণ মানুষকে ভোটমুখী করতে পারাই লুলার এই বৈতরণী পার হওয়ার মূল চাবিকাঠি ছিল।
লুলার ফিলিস্তিন নীতি ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের গোলকধাঁধা : ব্রাজিলের এই রাজনৈতিক পালাবদলে সবচেয়ে বেশি চর্চা হচ্ছে লুলার আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ফিলিস্তিনপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে। বিগত নির্বাচনী প্রচারণায় ফিলিস্তিনিদের ঐতিহ্যবাহী কেফিয়াহ গলায় জড়িয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, নির্যাতিত ফিলিস্তিনবাসীর প্রতি তার দল ও দেশের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সংহতি রয়েছে। লুলার আগের শাসনামলেই ব্রাজিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তিনি সবসময় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জোরালো প্রবক্তা।
তবে কূটনীতির মাঠে লুলা কেবল একমুখী নীতিতে বিশ্বাসী নন; বরং ইসরায়েলের সঙ্গেও তিনি একটি কার্যকরী ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। অতীতে তেল আবিবের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ডে নিজেকে তাদের বন্ধু হিসেবে দাবি করার রেকর্ডও তাঁর রয়েছে।
তাছাড়া দুই দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে কৌশলগত বাণিজ্যিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল লুলার আমলে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে আপসহীন মনোভাবের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্বের এই মেলবন্ধন কীভাবে তিনি সামনের দিনে বজায় রাখবেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ কৌতূহল রয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত এই নেতা বৈশ্বিক সংকট সমাধানে এবার কোন পথ বেছে নেন, সেটাই দেখার বিষয়।
সার্বিয়ায় ভুচিসের সাম্রাজ্যের পতন এবং তরুণ প্রজন্মের বিপ্লব : অন্যদিকে ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ায় ঘটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। দীর্ঘ সময় ধরে দেশ শাসন করা প্রভাবশালী শাসক আলেকসান্দার ভুচিস শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
দেশটির নতুন পার্লামেন্টের আসন বিন্যাসে বিরোধী ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ জোটটি অভাবনীয় সাফল্য পেয়ে ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে। পক্ষান্তরে, শাসকদল ভুচিসের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আটকে গেছে মোটে ১০৫টি আসনে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ভুচিস নিজেই সংবাদমাধ্যমের সামনে হেরে যাওয়ার কথা স্বীকার করে নেন।
এই ক্ষমতার পতনের পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে দেশটির তরুণ সমাজের দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের লাগাতার সরকারবিরোধী আন্দোলন। দেশটির নোভি সাদে এলাকায় একটি রেলওয়ে স্টেশনের ছাদ ভেঙে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১৬ জন নাগরিকের মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।
রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসা সেই তরুণেরাই গড়ে তোলে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ আন্দোলন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর ১৯৯২ সালের পর থেকে এটিই সার্বিয়ার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির রেকর্ড।
নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর রাজধানী বেলগ্রেডের রাজপথে সাধারণ মানুষের উল্লাস ও বাঁধভাঙা আনন্দ প্রমাণ করে যে পরিবর্তনের হাওয়া কতটা প্রবল ছিল। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে সরকারি দলের সমর্থকদের দখলে থাকা বিভিন্ন অস্থায়ী তাঁবু ও অবস্থান ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সাধারণ জনতা বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে।
ইসরায়েল সংযোগ ও বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন সমীকরণ : সার্বিয়ার নির্বাচনে ভুচিসের পতনের পেছনেও ইসরায়েল ফ্যাক্টরটি বেশ গভীরভাবে জড়িত ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেল আবিবের সঙ্গে বেলগ্রেডের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক काफी জোরদার হয়েছিল।
গাজায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেও সার্বিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক নানা ফোরামে ভোটদানের ক্ষেত্রে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। এমনকি যুদ্ধের মধ্যেই সার্বিয়া থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের তথ্যও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নীতিনির্ধারক ও ইসরায়েলি লবির সুনজর পেতেই ভুচিস মূলত নিজের দেশের ঐতিহ্যিক পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন।
সামগ্রিকভাবে লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলে ফিলিস্তিনপন্থী উদারনৈতিক নেতা লুলার পুনরুত্থান এবং পূর্ব ইউরোপের সার্বিয়ায় ইসরায়েলঘনিষ্ঠ ডানপন্থী শাসক ভুচিসের পতন—দুটি ভিন্ন ভূখণ্ডের ঘটনা হলেও এগুলো বর্তমান বিশ্বরাজনীতির জটিল ও পরস্পরবিরোধী প্রবণতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
সান নিউজ / রাজীব
