বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা আর্জেন্টিনা একের পর এক চমক দেখিয়ে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ২-১ গোলের জয় নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের করেছে লিওনেল স্ক্যালোনির দল।
ফাইনালে ওঠার পর টিওয়াসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি বলেন, এই জয় অন্য সব জয়ের চেয়ে আলাদা। কারণ এটি শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, বরং আর্জেন্টিনার মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
‘কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, আমরা বিশ্বের সেরা দল’: মেসি
মেসি বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা অসাধারণ কিছু অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমরা আগেও বলেছি, এটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। মাঠে নামার সময় এবং জাতীয় সংগীতের মুহূর্তে পুরো দল এক বিশেষ আবেগ অনুভব করেছে। এই জয় আর পাঁচটা জয়ের মতো নয়। এটি এমন একটি জয়, যা আর্জেন্টিনার মানুষ চেয়েছিল, আমরাও চেয়েছিলাম। আর এই জয় আমাদের আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে।’
টানা দুইবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার অনুভূতি প্রকাশ করে মেসি বলেন, ‘এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এই দলটি অসাধারণ। কঠিন পরিস্থিতিতেও আমরা কখনো হাল ছাড়িনি, বিশ্বাস হারাইনি। নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলেই আমরা ম্যাচে ফিরেছি। পিছিয়ে পড়ার পরও আমরা ইংল্যান্ডকে চাপে রেখেছিলাম। এই জয় আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের।’
আরেকটি রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তনের পর দলের মানসিকতার প্রশংসা করে মেসি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা যা অনুভব করছি তা অবিশ্বাস্য। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আমার এই দলের ওপর বিশ্বাস ছিল। আমি জানতাম আমরা শেষ পর্যন্ত লড়ব। আর আজ আমরা আবারও একটি ফাইনালে। টানা পাঁচটি বড় ফাইনাল, টানা দুইটি বিশ্বকাপ ফাইনাল; এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।’
দলের ঐক্য নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এই দল আমাকে অবাক করে না। আমরা জানতাম আমাদের সামর্থ্য কী। হয়তো অনেকের সন্দেহ ছিল, কারণ অনেক খেলোয়াড়ই শারীরিকভাবে সীমার শেষ প্রান্তে ছিল, চোটের সমস্যাও ছিল। কিন্তু এই দল যখন একসঙ্গে হয়, তখন সবাই একে অপরকে বাড়তি শক্তি দেয়। সবাই একে অপরকে অনুপ্রাণিত করে এবং নিজের ভেতর থেকে এমন কিছু বের করে আনে, যা আগে হয়তো নিজেরাও জানত না।’
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি আবারও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মতো একই বার্তা দেন। মেসি বলেন, ‘এই মুহূর্তটা উপভোগ করুন, যেমনটা আমরাও করছি। আমরা আবারও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে। আমরা আর্জেন্টিনাকে আবার বিশ্বের সেরা দুই দলের মধ্যে নিয়ে এসেছি। গত চার বছর ধরে আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে উপভোগ করছি, আর এখন আবারও ফাইনালে। এই মুহূর্তটা উপভোগ করুন। আমরা আজ সেই শেষ ধাপটি পার করেছি, যেটা সবাই চেয়েছিল, বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানো। এরপর যা হবে, তা ঈশ্বরের ইচ্ছা।’
স্পেনের বিপক্ষে আসন্ন ফাইনাল নিয়ে মেসি বলেন, ‘ওরা দারুণ একটি দল। অসাধারণ খেলোয়াড় রয়েছে, দুর্দান্ত একটি খেলার ধরন রয়েছে। বহু বছর ধরে একই দর্শনে খেলছে। আমি তাদের ভালোভাবেই চিনি। অনেকের বিপক্ষে খেলেছি, তাদের খেলা অনুসরণ করি। তাদের কয়েকজন বার্সেলোনায় খেলেন, যে ক্লাবকে আমি ভালোবাসি এবং সমর্থন করি। এটা একটি বিশেষ ম্যাচ, বিশ্বকাপের ফাইনাল। আমার মনে হয় ম্যাচটি খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।’
সমালোচকদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে মেসি বলেন, ‘বিশ্বকাপ জয়ের পর আবারও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছানো… গত চার বছর ধরে আমরা বিশ্বের সেরা দল, সেটা কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, যা-ই বলুক। আজ আমরা আবারও বিশ্বের সেরা দুই দলের মধ্যে। এটা প্রমাণ করে, আমাদের অর্জনগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় এবং কেউ আমাদের কিছু উপহার দেয়নি। টানা দুইটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠা খুব কম দলই পারে, আর এই দল সেটা করেছে।’
নিজের প্রস্তুতি সম্পর্কে মেসি জানান, ‘গত বছরই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। অবশ্যই স্কালোনির সঙ্গে আলোচনা করেই। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি সেরা শারীরিক অবস্থায় বিশ্বকাপে আসতে। পুরো এক বছর ধরে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। ডিসেম্বর মাসটা আমি আর্জেন্টিনায় কাটিয়েছি; সকাল-বিকেল অনুশীলন করেছি। আমি জানতাম, সেরা অবস্থায় থাকতে হবে, যাতে বিশ্বকাপটা উপভোগ করতে পারি। বিশ্বকাপ উপভোগ করতে হলে নিজের শরীর ভালো থাকা খুবই জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ কোপা আমেরিকায় আমি সেরা শারীরিক অবস্থায় ছিলাম না। দ্বিতীয় ম্যাচে চিলির বিপক্ষে চোট পাই। এরপর পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সেই সমস্যাটা নিয়ে খেলেছি। শেষ পর্যন্ত এমন এক চোট নিয়ে শেষ করি, যা পেশির ছিল না, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টেই অস্বস্তি অনুভব করেছি। হয়তো সবকিছুই কোনো কারণেই ঘটে। তাই এবার নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করেছি, যাতে সেরা অবস্থায় থাকতে পারি এবং বিশ্বকাপ উপভোগ করতে পারি।’
শেষে আর্জেন্টিনার জনগণের উদ্দেশে এই জয় উৎসর্গ করে মেসি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা আমাদের জন্য গর্বের এবং আনন্দের। বিশ্বকাপ আমাদের জন্য খুবই বিশেষ। এই সময়ে আমরা জীবনের সব কষ্ট ভুলে যাই। আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছেন, যাদের কাজ নেই, সংসার চালাতে কষ্ট হয়, জীবন সংগ্রামে ভরা। তাদের এমন আনন্দ দিতে পারা, আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা, টানা দুইবার ফাইনালে পৌঁছানো, এটা আমাদের জন্য বিশাল ব্যাপার।’
ইংল্যান্ডকে হারানোর গুরুত্ব নিয়ে তিনি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটি ছিল একটি বিশেষ ম্যাচ। আমরা হারতে পারতাম না। এই দল কারও কাছে কোনো ঋণী নয়, কিন্তু আপনারা তো জানেন আর্জেন্টাইনরা কেমন, আমরা সবসময় আরও বেশি চাই। আমার মনে হয়, যদি আজ আমরা হেরে যেতাম… (এরপর সাক্ষাৎকারের এই অংশটি অসম্পূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।)’
এটা ম্যারাডোনার জন্য একটি উপহার–ইংল্যান্ডকে হারানোর পর মেসি
এটা ম্যারাডোনার জন্য একটি উপহার–ইংল্যান্ডকে হারানোর পর মেসি
পিছিয়ে পড়ার পর আরও একবার দারুণ প্রত্যাবর্তনে জয় তুলে নিলো আর্জেন্টিনা। গত রাতে (১৫ জুলাই) আটলান্টা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। তবে জয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই নতুন এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে লিওনেল স্ক্যালোনির দল। ম্যাচ শেষে মাঠে প্রদর্শিত একটি পতাকাকে ঘিরে ফিফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে বলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আর্জেন্টিনাকে খোঁচা ক্যাসিয়াসের, ফাইনালে স্পেনের পক্ষেই বাজি
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতেই সামাজিক মাধ্যমে সরব হলেন স্পেনের কিংবদন্তি গোলকিপার ইকার ক্যাসিয়াস। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে লিওনেল মেসিদের ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর একের পর এক মন্তব্যে স্পেনের প্রতি নিজের সমর্থন জানিয়ে আর্জেন্টিনাকে খোঁচাও দিয়েছেন তিনি।
শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর টিওয়াসি স্পোর্টসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে লিওনেল মেসি এই জয় উৎসর্গ করেন দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনাকে। কারণ, ঠিক ৪০ বছর আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছিলেন এবং ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ক্ষত বহন করা আর্জেন্টাইন জনগণের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিলেন। ম্যাচ শেষে ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে ম্যারাডোনার গায়ে থাকা জার্সির একটি প্রতিরূপ মেসির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ম্যাতিয়াস পেল্লিসিওনির হাত থেকে জার্সি গ্রহণ করে মেসি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে দিয়েগো ওপরে থেকে এই মুহূর্তটা ভীষণ উপভোগ করছেন। আজকের দিনটা তার জন্য খুবই বিশেষ। তাকে এই আনন্দটা দিতে পেরে আমরা খুশি। তিনি যেভাবেই থাকুন না কেন, ওপরে থেকে যেন এটি উপভোগ করেন। এটাও তাঁর জন্য একটি উপহার।’
১৯৮৬ সালের ২২ জুন, মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ম্যারাডোনা মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে নিজেকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিলেন। ম্যাচের ৫০তম মিনিটে তিনি পিটার শিলটনকে পরাস্ত করে হাত দিয়ে বল স্পর্শ করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন, যে গোলটি পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি প্রায় পুরো ইংল্যান্ড দলকে কাটিয়ে অবিশ্বাস্য একক নৈপুণ্যে দ্বিতীয় গোলটি করেন। অনেকের মতে, সৌন্দর্য ও প্রতীকী গুরুত্বের বিচারে সেটিই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গোল।
ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ৪৪ বছর পর বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় সেই সময়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে আগের প্রজন্মের মতো আবেগগতভাবে যুক্ত নন। তবুও তারা ম্যাচের আগে ‘লাস মালভিনাস সন আরহেন্তিনাস (মালভিনাস/ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার)’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেছিলেন। আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হওয়ায় এই সেমিফাইনালটি তাদের কাছে ছিল বাড়তি আবেগ ও অনুপ্রেরণার ম্যাচ।
মেসি বলেন, ‘জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় কিছু একটা বিশেষ অনুভূতি হচ্ছিল। আমরা দর্শকদের গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছিলাম। সবাই যেন অন্যরকম আবেগ নিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইছিল, আর সেই আবেগ আমাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা জানতাম এটি একটি ফুটবল ম্যাচ, কিন্তু কখনও কখনও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সেই আবেগ নিয়েই ম্যাচটি খেলেছি।’
এই ম্যাচের মাধ্যমে মেসি আরও একটি রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়েছেন। আগামী রোববার নিউ জার্সিতে স্পেনের বিপক্ষে তিনি নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবেন, যা ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর রেকর্ডের সমান। পাশাপাশি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে নিজের ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ থাকবে তার সামনে। সেই সঙ্গে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের সুযোগ তো থাকছেই।
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কণ্ঠে এখন একটি গানই শোনা যাচ্ছে, ‘ফকল্যান্ডসের জন্য, দিয়েগোর জন্য, আর লিওর শেষ গোলের জন্য।’
আটলান্টার স্মরণীয় বিকেলে সেই তিনটির মধ্যে প্রথম দুটি যেন পূরণ হয়েছে। আর শেষ ইচ্ছাটি পূরণ হবে কি না, তার উত্তর মিলবে আগামী রোববারের (১৯ জুলাই) বিশ্বকাপ ফাইনালে।
শেষে আর্জেন্টিনার জনগণের উদ্দেশে এই জয় উৎসর্গ করে মেসি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা আমাদের জন্য গর্বের এবং আনন্দের। বিশ্বকাপ আমাদের জন্য খুবই বিশেষ। এই সময়ে আমরা জীবনের সব কষ্ট ভুলে যাই। আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছেন, যাদের কাজ নেই, সংসার চালাতে কষ্ট হয়, জীবন সংগ্রামে ভরা। তাদের এমন আনন্দ দিতে পারা, আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা, টানা দুইবার ফাইনালে পৌঁছানো, এটা আমাদের জন্য বিশাল ব্যাপার।’
ইংল্যান্ডকে হারানোর গুরুত্ব নিয়ে তিনি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটি ছিল একটি বিশেষ ম্যাচ। আমরা হারতে পারতাম না। এই দল কারও কাছে কোনো ঋণী নয়, কিন্তু আপনারা তো জানেন আর্জেন্টাইনরা কেমন, আমরা সবসময় আরও বেশি চাই। আমার মনে হয়, যদি আজ আমরা হেরে যেতাম… (এরপর সাক্ষাৎকারের এই অংশটি অসম্পূর্ণভাবে শেষ হয়েছে।)’
এটা ম্যারাডোনার জন্য একটি উপহার–ইংল্যান্ডকে হারানোর পর মেসি
এটা ম্যারাডোনার জন্য একটি উপহার–ইংল্যান্ডকে হারানোর পর মেসি
পিছিয়ে পড়ার পর আরও একবার দারুণ প্রত্যাবর্তনে জয় তুলে নিলো আর্জেন্টিনা। গত রাতে (১৫ জুলাই) আটলান্টা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। তবে জয়ের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই নতুন এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে লিওনেল স্ক্যালোনির দল। ম্যাচ শেষে মাঠে প্রদর্শিত একটি পতাকাকে ঘিরে ফিফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে বলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আর্জেন্টিনাকে খোঁচা ক্যাসিয়াসের, ফাইনালে স্পেনের পক্ষেই বাজি
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতেই সামাজিক মাধ্যমে সরব হলেন স্পেনের কিংবদন্তি গোলকিপার ইকার ক্যাসিয়াস। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে লিওনেল মেসিদের ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর একের পর এক মন্তব্যে স্পেনের প্রতি নিজের সমর্থন জানিয়ে আর্জেন্টিনাকে খোঁচাও দিয়েছেন তিনি।
শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর টিওয়াসি স্পোর্টসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে লিওনেল মেসি এই জয় উৎসর্গ করেন দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনাকে। কারণ, ঠিক ৪০ বছর আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছিলেন এবং ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ক্ষত বহন করা আর্জেন্টাইন জনগণের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিলেন। ম্যাচ শেষে ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে ম্যারাডোনার গায়ে থাকা জার্সির একটি প্রতিরূপ মেসির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ম্যাতিয়াস পেল্লিসিওনির হাত থেকে জার্সি গ্রহণ করে মেসি বলেন, ‘নিঃসন্দেহে দিয়েগো ওপরে থেকে এই মুহূর্তটা ভীষণ উপভোগ করছেন। আজকের দিনটা তার জন্য খুবই বিশেষ। তাকে এই আনন্দটা দিতে পেরে আমরা খুশি। তিনি যেভাবেই থাকুন না কেন, ওপরে থেকে যেন এটি উপভোগ করেন। এটাও তাঁর জন্য একটি উপহার।’
১৯৮৬ সালের ২২ জুন, মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ম্যারাডোনা মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে নিজেকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিলেন। ম্যাচের ৫০তম মিনিটে তিনি পিটার শিলটনকে পরাস্ত করে হাত দিয়ে বল স্পর্শ করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন, যে গোলটি পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। এরপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি প্রায় পুরো ইংল্যান্ড দলকে কাটিয়ে অবিশ্বাস্য একক নৈপুণ্যে দ্বিতীয় গোলটি করেন। অনেকের মতে, সৌন্দর্য ও প্রতীকী গুরুত্বের বিচারে সেটিই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গোল।
ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ৪৪ বছর পর বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় সেই সময়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে আগের প্রজন্মের মতো আবেগগতভাবে যুক্ত নন। তবুও তারা ম্যাচের আগে ‘লাস মালভিনাস সন আরহেন্তিনাস (মালভিনাস/ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার)’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেছিলেন। আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হওয়ায় এই সেমিফাইনালটি তাদের কাছে ছিল বাড়তি আবেগ ও অনুপ্রেরণার ম্যাচ।
মেসি বলেন, ‘জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় কিছু একটা বিশেষ অনুভূতি হচ্ছিল। আমরা দর্শকদের গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছিলাম। সবাই যেন অন্যরকম আবেগ নিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইছিল, আর সেই আবেগ আমাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা জানতাম এটি একটি ফুটবল ম্যাচ, কিন্তু কখনও কখনও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। আমরা সেই আবেগ নিয়েই ম্যাচটি খেলেছি।’
এই ম্যাচের মাধ্যমে মেসি আরও একটি রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়েছেন। আগামী রোববার নিউ জার্সিতে স্পেনের বিপক্ষে তিনি নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলবেন, যা ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর রেকর্ডের সমান। পাশাপাশি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে নিজের ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ থাকবে তার সামনে। সেই সঙ্গে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের সুযোগ তো থাকছেই।
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কণ্ঠে এখন একটি গানই শোনা যাচ্ছে, ‘ফকল্যান্ডসের জন্য, দিয়েগোর জন্য, আর লিওর শেষ গোলের জন্য।’
আটলান্টার স্মরণীয় বিকেলে সেই তিনটির মধ্যে প্রথম দুটি যেন পূরণ হয়েছে। আর শেষ ইচ্ছাটি পূরণ হবে কি না, তার উত্তর মিলবে আগামী রোববারের (১৯ জুলাই) বিশ্বকাপ ফাইনালে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
