বিদেশে বিয়ে, উন্নত জীবন ও আর্থিক নিরাপত্তার স্বপ্ন অনেক পরিবারের কাছে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। তবে সেই স্বপ্নকেই যদি কোনো সংঘবদ্ধ চক্র প্রতারণা ও নারী পাচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে বিষয়টি হয়ে ওঠে গভীর উদ্বেগের। সাম্প্রতিক সময়ে চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বাংলাদেশি নারীদের বিয়ে এবং পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসায় চীনে যাওয়ার সংখ্যা বাড়ায় এমন আশঙ্কা নতুন করে সামনে এসেছে।
শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—চীনা নাগরিককে বিয়ে করা বা বিয়ের পর চীনে যাওয়া নিজেই কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। একইভাবে চীনে যাওয়া সব বাংলাদেশি নারী পাচারের শিকার—এমন দাবিও তথ্যভিত্তিক নয়। বৈধভাবে বিয়ে করে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনের উদ্দেশ্যে বহু নারীই বিদেশে যাচ্ছেন।
তবে বিভিন্ন অভিযোগ, তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য ইঙ্গিত করছে, বৈধ বিয়ে ও পারিবারিক ভিসার ব্যবস্থাকে কিছু অপরাধী চক্র অপব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে। ফলে বিষয়টি নিয়ে আগেভাগেই কার্যকর নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মানবপাচারবিষয়ক একটি সাম্প্রতিক কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারী চীনে যাওয়ার জন্য কিউ-১ বা পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা নিয়েছেন।
তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬ জনে। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৭৮ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭২১ জন নারী এই ভিসায় চীনে যান।
শুধু ভিসার সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। তবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এত বড় পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা বিশদভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদেশে বিয়ে ও উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারীকে চীনে নেওয়ার অভিযোগ যখন বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের নারীদের কাছে বিদেশে বিয়ের মাধ্যমে নিরাপদ ও স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখান। কখনো বলা হয়, পাত্র বিত্তশালী; কখনো উন্নত বাড়ি, স্থায়ী বসবাস কিংবা পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কিছু অভিযোগে জাল কাগজপত্র, ভুয়া ঠিকানা এবং সন্দেহজনক বিয়ের নথি ব্যবহারের কথাও এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
আরও গুরুতর কিছু অভিযোগে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অচেতন করার জন্য মাদক প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানোর মতো বিষয় উঠে এসেছে। এসব অভিযোগ অবশ্যই পৃথকভাবে তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র বাংলাদেশি নারীদের পাচার করছে কি না, তা কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে?
মানবপাচারকারীরা সাধারণত মানুষের দুর্বলতা ও স্বপ্নকে কাজে লাগায়। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক বৈষম্য এবং বিদেশে উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে।
বিদেশে বিয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত পাত্রের পরিচয়, ঠিকানা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, আয় এবং পারিবারিক তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা। একই সঙ্গে যিনি বিদেশে যাচ্ছেন, তিনি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় যাচ্ছেন কি না এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত কি না, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম গত কয়েক বছরে বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়েছে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, উৎপাদন, প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে।
এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু মানুষের চলাচল ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ যত বাড়বে, বৈধ ব্যবস্থার আড়ালে অপরাধী চক্র ঢোকার সম্ভাবনাও ততটা বিবেচনায় রাখতে হবে।
তাই বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের মালিকানা, প্রকৃত সুবিধাভোগী, অর্থের উৎস ও গন্তব্য এবং স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি থাকা প্রয়োজন। এই নীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের জন্য নয়, সব বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রয়োগ করা উচিত।
বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের মাধ্যমে নারী পাচারের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও প্রতারণা, জোরপূর্বক বিয়ে কিংবা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব ঘটনার পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ থাকে। দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, পরিচয় যাচাইয়ের দুর্বলতা, সীমান্ত নজরদারির ঘাটতি এবং সক্রিয় দালালচক্র—সব মিলেই পাচারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চীনের কিছু অঞ্চলের জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতাকে এ বিষয়ে একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে আলোচনা করা হলেও সেটিকে কোনো অপরাধের সরল কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অপরাধের দায় সবসময় অপরাধীরই।
মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের আইন ও নীতিমালা রয়েছে। বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর যাচাইব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই ঝুঁকি দূর হবে না।
পুলিশ, সিআইডি, বিশেষ শাখা, ইমিগ্রেশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো বিয়ের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতা থাকলে একাধিক সংস্থার তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
বিয়ে নিবন্ধনকারী বা কাজির কার্যালয় কোনো ধরনের জালিয়াতি বা পাচারে সহযোগিতা করলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সন্দেহজনক বড় অঙ্কের লেনদেন শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
পাচার ঠেকানোর নামে বিদেশগামী সব নারীকে সন্দেহের চোখে দেখা কোনো সমাধান নয়। বাংলাদেশি নারীদের শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে কিংবা পারিবারিক কারণে বিদেশ যাওয়ার অধিকার রয়েছে।
তাই বিমানবন্দরে নজরদারি হতে হবে তথ্য ও ঝুঁকির ভিত্তিতে। বিয়ের নথিতে অসঙ্গতি, যাত্রাপথে অস্বাভাবিকতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ কিংবা যাত্রীর ওপর চাপ প্রয়োগের মতো নির্দিষ্ট আলামত থাকলে তা গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা যেতে পারে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্ভাব্য পাচারের শিকারকে শনাক্ত করা, বিদেশযাত্রার অধিকার অযথা বাধাগ্রস্ত করা নয়।
কোনো বাংলাদেশি নারী চীনে গিয়ে পাচার বা নির্যাতনের শিকার হলে শুধু বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে সব তথ্য সংগ্রহ করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, বিয়ের নথি, বসবাসের ঠিকানা, আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য দালালদের তথ্য জানতে দুই দেশের সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তাই তথ্য বিনিময়, যৌথ তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের অনুসরণ, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ আরও জোরদার করা দরকার।
বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব এলে পরিবারকে আবেগের পরিবর্তে তথ্য যাচাইকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাত্রের প্রকৃত পরিচয়, ঠিকানা, পেশা, আয়, বৈবাহিক ইতিহাস এবং বাংলাদেশে তার সঙ্গে যোগাযোগকারী ব্যক্তিদের সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার আগে নারীদের জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় পরামর্শসেবা থাকা প্রয়োজন। সেখানে তারা কোনো ধরনের পারিবারিক চাপ ছাড়াই বিয়ে, ভিসা ও বিদেশযাত্রার সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য জানতে পারবেন।
চীনে যাওয়ার জন্য ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারীর কিউ-১ ভিসা নেওয়া কোনোভাবেই নারী পাচারের পরিসংখ্যান নয়। এই নারীদের কতজন কোনো অপরাধের শিকার হয়েছেন, সেই সংখ্যাও স্পষ্ট নয়।
কিন্তু ভিসা গ্রহণের সংখ্যায় দ্রুত পরিবর্তন এবং পাশাপাশি উঠে আসা প্রতারণা ও পাচারের অভিযোগগুলোকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। তাই আতঙ্ক সৃষ্টি না করে তথ্যভিত্তিক তদন্ত, কঠোর যাচাই এবং আন্তদেশীয় সহযোগিতার মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। সেই সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
বিদেশে বিয়ের সুযোগ যেন কোনো অপরাধী চক্রের হাতে পাচারের পথ হয়ে না ওঠে—এ জন্য এখনই সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সান নিউজ/ জামান
