রকসংগীতের দুনিয়ায় কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না, বরং আস্ত একটা সময়কে ধারণ করে বেঁচে থাকে। প্রেম, বিরহ, দ্রোহ কিংবা জীবনের গহন অনুভূতি—সবকিছুই তার কণ্ঠে পায় এক অন্যরকম রূপ। বলছি বাংলার রক লেজেন্ড ফারুক মাহফুজ আনাম, যাঁকে আমরা এক ডাকে ‘জেমস’ বা ‘গুরু’ বলে চিনি। তরুণ বয়সে গিটার কাঁধে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন যিনি, আজ তিনি কোটি তরুণের হৃদয়ের স্পন্দন।
ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি ছিল তার এক অদ্ভুত নেশা। পরিবারের কড়া বাধা উপেক্ষা করে তিনি পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। সে শহরের ঐতিহাসিক আজিজ বোর্ডিংয়ের একটি ছোট্ট ঘরে বসে শুরু হয়েছিল তার সংগ্রামী জীবন। সেই কঠিন দিনগুলোতেও গানকে ভালোবেসে নিজের একটি আলাদা জগৎ তৈরি করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
১৯৮০ সালে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ড গড়ার মধ্য দিয়ে পেশাদার সংগীতের আলোয় আসেন জেমস। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। এরপর ১৯৮৮ সালে তার একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’ বাজারে এলে চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। একে একে ‘জেল থেকে বলছি’, ‘নগর বাউল’, ‘লেইস ফিতা লেইস’-এর মতো দুর্দান্ত সব অ্যালবাম উপহার দিয়ে ব্যান্ডসংগীতের ধারাটাই বদলে দেন তিনি। সময়ের বিবর্তনে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের নাম বদলে রাখা হয় ‘নগর বাউল’।
ব্যান্ডের পাশাপাশি একক কণ্ঠের জাদুতেও তিনি জয় করেছেন অগণিত শ্রোতার মন। ‘পালাবি কোথায়’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’, ‘ঠিক আছে বন্ধু’, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’ বা ‘তুফান’—প্রতিটি অ্যালবামই বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ। ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেব’, ‘মা’, ‘বাংলাদেশ’ কিংবা ‘পাগলা হাওয়া’র মতো গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসছে।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে জেমসের কণ্ঠের জাদু ছড়িয়ে পড়েছিল বলিউডের রূপালী পর্দায়ও। ২০০৬ সালে অনুরাগ বসুর ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমায় ‘ভিগি ভিগি’ গান গেয়েই তাক লাগিয়ে দেন তিনি। এরপর ‘ওহ লামহে’ কিংবা ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’র মতো সিনেমাতেও তাঁর গান দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। বলিউডে স্থায়ী হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব পেলেও শেকড়ের টানে তিনি ফিরে এসেছিলেন নিজের দেশে। দেশপ্রেমের এমন অনন্য দৃষ্টান্ত আজও বিরল।
সংগীতের স্বীকৃতিস্বরূপ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেও তিনি এনেছেন বড় সম্মান। ২০১৪ সালের ‘দেশা: দ্য লিডার’ এবং ২০১৭ সালের ‘সত্তা’ সিনেমার জন্য সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে জিতে নেন মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মঞ্চে তার গিটারের অ্যাকর্ড আর সেই কর্কশ অথচ মায়াবী কণ্ঠের জাদুকরি উপস্থিতি আজও যেকোনো কনসার্টকে মাতিয়ে তুলতে একাই যথেষ্ট।
সান নিউজ/রাজীব
