২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র এক মাসের কিছু বেশি সময় বাকি থাকলেও বাংলাদেশে এখনো টুর্নামেন্টটির সম্প্রচার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিপুল স্বত্বমূল্য, সীমিত বিজ্ঞাপন বাজার, ম্যাচের প্রতিকূল সময়সূচি এবং সরকারের অনাগ্রহের কারণে এখন পর্যন্ত দেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল বা সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপের মিডিয়া স্বত্ব কিনতে পারেনি।
ফলে দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী ‘ওয়ার্ল্ড কাপ ব্ল্যাকআউট’-এর আশঙ্কায় রয়েছেন। বাংলাদেশে বিশ্বকাপের স্বত্বধারী সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড প্রায় ১৫১ কোটি টাকার বেশি দাবি করছে, যা কর-ভ্যাটসহ প্রায় ২০০ কোটিতে পৌঁছতে পারে। সরকার বলছে, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি ও আগের চুক্তি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে তারা এবার স্বত্ব কিনতে আগ্রহী নয়।
বেসরকারি সম্প্রচারকারীরাও চড়া মূল্যের কারণে পিছিয়ে আছে। একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে ভারত ও চীনেও। ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হতে যাওয়া ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই।
বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বড় দুঃসংবাদ হতে পারে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ ব্ল্যাকআউট’। চার বছর আগে সরকারি চ্যানেল বিটিভি টেরেস্ট্রিয়াল স্বত্ব কিনেছিল। পাশাপাশি বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল টি স্পোর্টস ও জিটিভি স্বত্ব সংগ্রহ করে ৬৪টি ম্যাচই সরাসরি সম্প্রচার করেছিল। আর ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের দায়িত্বে ছিল টফি।
তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশে বিশ্বকাপের মিডিয়া স্বত্ব পাওয়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড’ বিশাল অংকের অর্থ দাবি করায় এখন পর্যন্ত কোনো কূল-কিনারা হয়নি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি এবং আগের চুক্তি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় সরকার এবার স্বত্ব কিনতে আগ্রহী নয়। স্বপন বলেন, ‘মনে হচ্ছে গতবার কেনার পেছনে যে টাকা খরচ করা হয়েছিল, তার ১০ ভাগের এক ভাগও তুলে আনা সম্ভব হয়নি।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সরকারের বর্তমান আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় এটি একটি বড় ফ্যাক্টর। সরকারি চ্যানেলে খেলা দেখাতে পারলে দর্শকদের জন্য ভালো হতো, কিন্তু আর্থিক পরিস্থিতির কথা ভেবে আমরা এই মুহূর্তে তা নিয়ে ভাবছি না। তবে বেসরকারি পর্যায়ে কেউ আগ্রহ দেখালে সরকার পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সহযোগিতার কথা ভাবতে পারে।’
ফিফার কাছ থেকে নেওয়া স্প্রিংবকের এই প্যাকেজে টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল ও ইন্টারনেটের সব ধরনের স্বত্ব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, বিটিভি-র কাছে স্প্রিংবক ১ কোটি ২৩ লাখ ডলার (প্রায় ১৫০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা) দাবি করছে। এর মধ্যে কর (ট্যাক্স), অগ্রিম আয়কর এবং ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত নেই। শর্ত অনুযায়ী, এই অর্থের ৫০ শতাংশ আগামী ১০ মে-র মধ্যে এবং বাকিটা ১০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এই প্যাকেজের আওতায় উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানসহ মোট ১০৪টি ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার ও হাইলাইটস দেখানোর সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টি স্পোর্টস, স্টার নিউজ এবং একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান অনেক কম মূল্যে স্বত্ব কেনার প্রস্তাব দিলেও স্প্রিংবক তাদের দাবিতে অনড়। ফলে ভ্যাট-ট্যাক্স মিলিয়ে খরচ প্রায় ২০০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে। অথচ সূচি অনুযায়ী, ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৫২টিই শেষ হবে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টার মধ্যে, আর বাকি ৫২টি শুরু হবে ভোর ৪টার পর।
২০২২ বিশ্বকাপের আগে শেষ মুহূর্তে সরকারের সিদ্ধান্তে ৯৮ কোটি টাকা খরচ করে স্বত্ব কিনেছিল বিটিভি। সেবার টি স্পোর্টস ও জিটিভি আলাদাভাবে স্যাটেলাইট স্বত্ব কিনেছিল।
অথচ ২০১৮ বিশ্বকাপে কোনো খরচ ছাড়াই ফিড পেয়েছিল বিটিভি এবং বিজ্ঞাপন থেকে প্রায় এক দশমিক পাঁচ কোটি টাকা আয় করেছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিভির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এবারের টুর্নামেন্ট নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি জানান, স্প্রিংবক প্রথমে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে, যা পরে বিটিভির কাছে পাঠানো হয়।
এরপর গত মাসে বিটিভি স্প্রিংবকের কাছে দাম জানতে চায়। পাশাপাশি বিনামূল্যে ফিড পাওয়া যায় কি না, তা জানতে ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর মেলেনি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ফিফা যে টেন্ডার আহ্বান করেছিল, তাতে বিটিভি বা সরকার অংশ নেয়নি। অংশ নিলে হয়তো অনেক কম দামে স্বত্ব পাওয়া যেত।
বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা স্প্রিংবকের সঙ্গে আলোচনায় থাকলেও চড়া দামের কারণে তা থমকে গেছে।
ব্রডকাস্টারদের মতে, বিটিভি যদি ব্যয়ের ভার শেয়ার না করে, তবে বাংলাদেশের বাজারের জন্য এই দাম কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা সাব-লাইসেন্সিংয়ের চেয়ে যৌথ উদ্যোগের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন।
তাদের ধারণা, ২০২২ সালে বিটিভি ৯৮ কোটি টাকায় স্বত্ব কিনেছিল বলেই এবার ফিফা বাংলাদেশের বাজারমূল্য অনেক বাড়িয়ে ধরেছে। যেহেতু ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে ১০৪ হয়েছে, তাই দামও প্রায় দ্বিগুণ চাওয়া হচ্ছে।
ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি কেবল বাংলাদেশে নয়, ভারত ও চীনের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের ওপরও ঝুলছে।
রয়টার্সের তথ্যমতে, রিলায়েন্স-ডিজনি যৌথভাবে ভারতীয় স্বত্বের জন্য ২০ মিলিয়ন ডলারের মতো প্রস্তাব দিয়েছে, যা ফিফার চাহিদার চেয়ে অনেক কম। সনি কোনো প্রস্তাব দিতেই রাজি হয়নি।
চীনেও এখন পর্যন্ত কোনো অফিশিয়াল ব্রডকাস্টারের নাম ঘোষিত হয়নি, অথচ গত বিশ্বকাপে বৈশ্বিক ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়া ভিউয়িংয়ের প্রায় অর্ধেকই এসেছিল এই দেশ থেকে।
প্রসঙ্গত, আগামী ১১ জুন বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে।
সাননিউজ/আরএ
