আর্জেন্টিনা ফুটবলে ‘লিওনেল’ নামটি মানেই অন্যরকম এক আবেগ। নীল-সাদা জার্সিতে সদ্য বিদায় নেওয়া কিংবদন্তি লিওনেল মেসির পর এবার আলো ছড়াতে শুরু করেছেন আরও এক তরুণ তুর্কি, যাঁর পুরো নাম লিওনেল বেনজামিন ফ্লোরেস। তবে ফুটবল মহলে তিনি পরিচিত ‘বেনজা’ নামে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া এই কিশোরের গল্পটা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়।
বুয়েনস এইরেসের উত্তর প্রান্তের সবচেয়ে দরিদ্র জনপদগুলোর একটি ভিয়া লা কাভা। এখানকার বস্তি থেকে উঠে আসা বেনজার জীবনটা শুরু থেকেই ছিল লড়াইয়ে ভরা। মাত্র সাত বছর বয়সে বোকা জুনিয়র্সের স্কাউটদের চোখে ধরা পড়েন তিনি। এরপর দীর্ঘ দশ বছর ধরে নিয়ম করে রোজ ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে বাসে চড়ে অনুশীলনে যাওয়া—এভাবেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর। এই অদম্য জেদই ফ্লোরেসকে নিয়ে এসেছে আজকের অবস্থানে।
ছোটবেলা থেকেই ফ্লোরেসের ব্যতিক্রমী প্রতিভা টের পেয়েছিলেন তার প্রথম কোচ ক্রিস্তিয়ান বেনিতেস। রিভার প্লেটের সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও বেনিতেস এখন পরম ভালোলাগায় বোকা জুনিয়র্সের ম্যাচ দেখেন এই শিষ্যের টানে। ছোটবেলায় পাড়ার ক্লাবে পাঁচ বছর বয়স থেকেই বেনজার অসাধারণ ওভারহেড কিক করার মুন্সিয়ানা সবার নজর কাড়ত। কোচদের মতে, শুধু মাঠে নামার তাড়না নয়, নিজের খেলা শাণিত করতে জেরেমি ডোকু কিংবা জামাল মুসিয়ালার মতো তারকাদের ম্যাচ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন ফ্লোরেস। অর্থাৎ, স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি নিজের হোমওয়ার্কেও বেশ পটু তিনি।
মাঠের খেলায় ফ্লোরেস এক বহুমুখী প্রতিভা। উইংয়ের দুই প্রান্ত, নিখাদ স্ট্রাইকার কিংবা মূল স্ট্রাইকারের পেছনের লিংকেজ পজিশন—কোথায় খেলবেন না তিনি! জার্সি নম্বর ৭, ৯, ১০ কিংবা ১১, দলের চাহিদা অনুযায়ী যেকোনো জায়গাতেই দারুণ সাবলীল। ফ্লোরেসের গতি এবং দারুণ ড্রিবলিং স্কিলই ডিফেন্ডারদের ঘুম হারাম করার জন্য যথেষ্ট। বোকার মূল দলে সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই নিজের নামের প্রতি সুবিচার করে চলেছেন এই ফরোয়ার্ড।
গত জুলাইয়ে বোকার জার্সিতে অভিষেকের পর থেকেই যেন পাল্টে গেছে তাঁর টাইমলাইন। সেপ্টেম্বরে স্কালোনির কোচিংয়ে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে লিওনেল ফ্লোরেসের । এরপর মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে চার ম্যাচ খেলার মতো ধকলও সামলেছেন তিনি। তবে এত দ্রুত সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানো এই কিশোরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে নারাজ আর্জেন্টিনা টিম ম্যানেজমেন্ট। কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই প্রতিভাকে নিংড়ে নেওয়ার চেয়েও বেশি প্রয়োজন তাঁর সঠিক পরিচর্যা ও পাশে থাকা।
ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর পাশাপাশি ফ্লোরেসের মতো তরুণদের ঘিরে এখন ভবিষ্যতের সোনালী স্বপ্ন বুনছে আলবিসেলেস্তেরা। ভোরের বাসে চড়ে যে কিশোর একসময় স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল, সে আজ খোদ আর্জেন্টিনার জার্সিতে নতুন ইতিহাসের সারথি। ফ্লোরেসের এই পথচলা কেবল একজন ফুটবলারের উত্থান নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে অদম্য ইচ্ছা থাকলে কঠিন বাস্তবতাকেও জয় করা সম্ভব।
সান নিউজ / রাজীব
