নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের কোনো পাথুরে গ্রহের পৃষ্ঠদেশ স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
রয়টার্স লিখেছে, পৃথিবী থেকে ৪৯ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত বায়ুমণ্ডলহীন এ গ্রহটির পরিবেশ চরম ও বৈরী। এ আবিষ্কার ভিনগ্রহের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও সেখানে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা বুঝতে বিজ্ঞানীদের নতুন পথ দেখাচ্ছে।
এ পাথুরে গ্রহটির নাম ‘এলএইচএস ৩৮৪৪’, যা ‘কুয়া-কুয়া’ বা কোস্টারিকার আদিবাসী ভাষায় প্রজাপতি নামেও পরিচিত। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৯ আলোকবর্ষ দূরে সূর্যের চেয়ে ছোট ও কম উজ্জ্বল এক তারাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে এ গ্রহ, যার আকার পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বড়।
এক আলোকবর্ষ বলতে আলো এক বছরে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে বোঝায়, যা প্রায় নয় দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।
জেমস ওয়েবের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রহটি প্রাণহীন ও বায়ুমণ্ডলহীন এক জগত, যার উপরিভাগ অনেকটা আমাদের সৌরজগতের বুধ গ্রহের মতো পাথুরে।
গ্রহটিতে কোনো স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল না থাকায় সেখানকার তাপমাত্রা অনেক। এর যে পাশ তারার দিকে সেখানে প্রচণ্ড উত্তাপ ও উল্টো পাশে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। আবহাওয়ার এ চরম প্রতিকূলতার কারণে গ্রহটি প্রাণের বসবাসের জন্য একেবারেই অনুপযোগী।
জার্মানির ‘ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এ গবেষণার প্রধান লেখক লরা ক্রাইডবার্গ গ্রহটি সম্পর্কে বলেন, গ্রহটি মোটেও ভালো কোনো জায়গা নয়।
গ্রহটিকে ‘নরকতুল্য ও ঊষর পাথুরে ভূমি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি, যা আমাদের সৌরজগতের বুধ গ্রহের সঙ্গেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। বুধ গ্রহে বায়ুমণ্ডলের কোনো নামগন্ধ নেই, বরং এর পরিবর্তে বিজ্ঞানীরা অন্ধকার ও বেশ প্রাচীন পৃষ্ঠ দেখতে পেয়েছেন।
গবেষক ক্রাইডবার্গ বলেন, কোটি কোটি বছর ধরে মহাকাশে ছুটে চলা এক নগ্ন পাথরের টুকরা যেমন হতে পারে গ্রহটি ঠিক তেমনই, যেখানে কেউই আসলে যেতে চাইবে না।
জেমস ওয়েবের এসব পর্যবেক্ষণ থেকে ইঙ্গিত মেলে, গ্রহটির পৃষ্ঠদেশ প্রাচীন ও গাঢ় রঙের ‘রেগোলিথ’ বা আলগা পাথুরে ধূলিকণায় ঢাকা। দীর্ঘ সময় ধরে তারার বিকিরণ ও ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের অনবরত আঘাতে কঠিন শিলাস্তর ভেঙে এ চূর্ণবিচূর্ণ পদার্থের স্তর তৈরি হয়েছে।
বায়ুমণ্ডল না থাকার কারণে মহাজাগতিক এসব আঘাত সরাসরি গ্রহটির পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে একে এমন বিদ্ধ ও জরাজীর্ণ করে তুলেছে।
২০২১ সালে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা ও ২০২২ সাল থেকে পুরোদমে কার্যক্রম শুরু করা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে ধারণাই বদলে দিয়েছে।
এ টেলিস্কোপের শক্তিশালী ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বিজ্ঞানীদের জন্য এসব গ্রহের রাসায়নিক গঠন, অভ্যন্তরীণ গতিবিধি ও সেখানকার মেঘের ধরন বোঝার পথও সহজ করে দিয়েছে।
ম্যাসাচুসেটসের ‘হার্ভার্ড অ্যান্ড স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এর গবেষক ও এ গবেষণার প্রধান লেখক সেবাস্তিয়ান জাইবা বলেন, জেমস ওয়েব এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সরাসরি এসব ভিনগ্রহের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও পৃষ্ঠের গঠন নিয়ে পড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
‘জেমস ওয়েব আসার আগে এ কাজটি ছিল চ্যালেঞ্জিং। এ গবেষণার মাধ্যমে আমরা এখন পৃথিবী ও সৌরজগতকে মহাকাশের বড় প্রেক্ষাপটে রেখে বিচার করতে পারছি। ফলে অন্য তারাকে কেন্দ্র করে ঘোরা বিভিন্ন গ্রহের গঠন বা প্রক্রিয়া আমাদের চেনা সৌরজগতের মতো কি না তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।’
‘এ সাফল্যটি অনেকটা এমন যেন আমরা হঠাৎ আমাদের চশমাটি পরিষ্কার করে ফেললাম এবং প্রথমবারের মতো গ্রহগুলোকে স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ পেলাম।’
গ্রহটি যে তারাটিকে কেন্দ্র করে ঘোরে সেটি মহাকাশের সাধারণ ধরনের এক তারা, যাকে ‘রেড ডোয়ার্ফ’ বা লাল বামন বলে। তারাটির ভর আমাদের সূর্যের কেবল ১৫ শতাংশ ও এর উজ্জ্বলতা সূর্যের কেবল হাজার ভাগের তিন ভাগ।
গ্রহটি নিজের তারার খুব কাছাকাছি অবস্থিত এবং কেবল ১১ ঘণ্টায় একবার একে প্রদক্ষিণ করে। পৃথিবী থেকে চাঁদকে আমরা যেমন সবসময় একপাশেই দেখি এ গ্রহটিও তেমনি এর তারার সঙ্গে ‘টাইডালি লকড’ অবস্থায় আছে, অর্থাৎ গ্রহটির একপাশ সবসময় তারার দিকে মুখ করে থাকে এবং অন্যপাশ সবসময় অন্ধকারের দিকে থাকে।
তারার খুব কাছে থাকায় গ্রহটির যে অংশ সবসময় তারার দিকে থাকে বা দিনের বেলায় সেখানকার তাপমাত্রা প্রায় ৭২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়।
তবে এর উল্টো দিকে বা রাতের বেলা কোনো তাপমাত্রার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। জেমস ওয়েবের শক্তিশালী ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি শনাক্তকরণ সক্ষমতার সাহায্যে গবেষকরা সরাসরি গ্রহটির পৃষ্ঠ থেকে আসা আলো পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন।
গবেষক জাইবা বলেন, বায়ুমণ্ডলের মতো বিভিন্ন ধরনের পাথরেরও আলাদা ‘স্পেকট্রাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ বা আলোর নিজস্ব স্বাক্ষর থাকে। আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, গ্রানাইটের মতো উজ্জ্বল পাথরের চেয়ে ব্যাসাল্টের মতো কালো আগ্নেয় শিলা গ্রহটির উপরিভাগের গঠনের সঙ্গে বেশি মেলে। হতে পারে গ্রহটির উপরিভাগ প্রাচীন ও গাঢ় রঙের আগ্নেয় শিলা দিয়ে গঠিত।
বুধ ও চাঁদের উপরিভাগও ব্যাসাল্ট জাতীয় শিলা দিয়ে গঠিত।
গবেষক জাইবা বলেন, পৃথিবীতে গ্রানাইট পাথরের ব্যাপক উপস্থিতির সঙ্গে পানি ও ‘প্লেট টেকটোনিকস’ বা পৃথিবীর উপরিভাগের বড় বিভিন্ন স্তরের ধীর নড়াচড়া প্রক্রিয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে যদি কোনো ভিনগ্রহে গ্রানাইট সদৃশ পৃষ্ঠের সন্ধান মেলে তবে তা সরাসরি প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণ না করলেও অন্তত প্রমাণ করবে, গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস অনেকটা আমাদের পৃথিবীর মতো।
জেমস ওয়েবের পর্যবেক্ষণে আরও এক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়েছিল, গ্রহটি হয়তো সাম্প্রতিক কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে তৈরি নতুন শিলা দিয়ে ঢাকা। তবে, গবেষকরা সেখানে সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো আগ্নেয়গিরি সংশ্লিষ্ট কোনো গ্যাসের অস্তিত্ব পাননি।
যেহেতু গ্রহটিতে কোনো বায়ুমণ্ডল নেই ফলে তারার ক্ষতিকর বিকিরণ বা চার্জিত কণা থেকে সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থাও সেখানে নেই। বায়ুমণ্ডলহীন অবস্থায় সেখানে তরল পানির অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়, যা প্রাণ বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
সব মিলিয়ে গবেষক জাইবা বলেন, গ্রহটি কোনোভাবেই বসবাসের উপযোগী নয়।
সাননিউজ/আরএ
