দেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পদ্মায় একটি অত্যাধুনিক ‘ওয়াই-আকৃতি’র দ্বিতীয় সেতু, রংপুরসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার জট ছুটাতে বহুল প্রত্যাশিত দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং দেশের কৃষি ও নদী রক্ষা সংক্রান্ত মেগা প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারেজ’। সরকারের এই আকস্মিক ও দূরদর্শী ঘোষণায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এবং গতিশীলভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বহুল আলোচিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ অত্যন্ত জোরেশোরে চলছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের অর্থাৎ ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এই সমীক্ষার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পরই প্রকৌশলগত অবস্থান, চূড়ান্ত নকশা এবং এই মেগা প্রকল্প দুটিতে ঠিক কত হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।
█ প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ: নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হোক পদ্মা ব্যারেজ ও দুই সেতুর কাজ
█ নির্দেশনা: যোগাযোগ খাতের মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়াতে হবে
█ সরকারের বড় পদক্ষেপ: পদ্মায় ওয়াই-সেতু ও যমুনা সেতু নির্মাণে সবুজ সংকেত
█ প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার: দেশের যোগাযোগব্যবস্থা বদলে দিতে হবে দ্রুত
█ মেগাপ্রকল্প রূপায়ণ: পদ্মা ব্যারেজ ও দুই নতুন সেতু নির্মাণে কঠোর নজরদারি
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর রূপরেখা নিয়ে বৈঠকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সেতুটি হবে ‘ওয়াই-আকৃতি’র বা ওয়াই-টাইপ সংযোগব্যবস্থার। এই বিশেষ ডিজাইনের কারণে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বিপ্লব ঘটবে।
শুধু তাই নয়, এর ফলে দেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর মোংলা এবং বেনাপোল ও দর্শনার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরগুলোর সঙ্গে এক শক্তিশালী ও বিকল্প যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি হবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশের অবহেলিত উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া অত্যন্ত কৌশলগত ও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প নিয়েও বৈঠকে গভীর পর্যালোচনা করা হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা শুষ্ক মৌসুমের তীব্র পানির সংকট মোকাবেলা, কৃষিজমি ও উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি, নদীর স্বাভাবিক প্রাকৃতকি প্রবাহ বজায় রাখা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার পাশাপাশি এই ব্যারেজের ওপর দিয়েই সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা যায় কি না—তার সম্ভাব্যতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রকল্পগুলোর বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে অর্থের উৎস ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা, দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের যথাযথ পুনর্বাসন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাদের মধ্যে পারস্পরিক আন্তসমন্বয় আরও কঠোরভাবে জোরদার করার ওপর বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের সামনে সরকারের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করে জানান যে, নীতিগতভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এবং এই তিনটি মেগা প্রকল্পই বাস্তবে রূপ নেবে। পদ্মা ব্যারেজ, ওয়াই-টাইপের দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতু—সবকটির কাজই ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করবে।
পদ্মা ব্যারেজের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্ত্রী জানান যে, এই প্রকল্পটি ইতিমধ্যেই বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে এবং এটি একনেক (ECNEC) পর্যন্ত পাস হয়ে আছে। তবে পরবর্তীতে বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের সময় দেখা যায় যে, কাছাকাছি দূরত্বেই একটি ওয়াই-টাইপ সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই দুই প্রকল্পের কাজের মধ্যে যাতে কোনো ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি না হয় এবং নিখুঁত সমন্বয় সাধিত হয়, সে বিষয়েই মূলত সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো কেন্দ্রীভূত ছিল।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু প্রসঙ্গে সেতুমন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে যুক্ত করতে এই সেতুর বিকল্প নেই। এটি বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ এবং এ বিষয়ে নীতিগত সবুজ সংকেত মিলেছে। এখন কেবল মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
উল্লেখ্য, এই উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সেতুমন্ত্রীর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানসহ অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, সেতু সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ, পানিসম্পদ সচিব ড. এ. কে. এম. শাহাবুদ্দিন এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সান নিউজ / রাজীব
