লন্ডনের একটি নৈশক্লাবে সংগীত প্রযোজকের মাথায় মদের বোতল দিয়ে আঘাত করার ঘটনায় কারাগারে যেতে হচ্ছে না গ্র্যামি পুরস্কারজয়ী মার্কিন সংগীতশিল্পী ক্রিস ব্রাউনকে। এ ঘটনায় তাঁকে আট মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে এক বছরের জন্য সাজা স্থগিত থাকায় আপাতত কারাভোগ করতে হচ্ছে না তাঁকে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সাউথওয়ার্ক ক্রাউন আদালতে এ রায় দেওয়া হয়। ৩৭ বছর বয়সী এই সংগীতশিল্পী ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনের অভিজাত মেফেয়ার এলাকার টেপ নামের একটি ব্যক্তিগত নৈশক্লাবে হামলার ঘটনায় জড়িত ছিলেন। নিজের দোষ স্বীকার করায় তাঁর সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
আদালতে উপস্থাপিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ক্রিস ব্রাউন তাঁর সাবেক বন্ধু ও সংগীত প্রযোজক আব্রাহাম দিয়াওয়ের মাথায় কাচের বোতল দিয়ে দুবার আঘাত করেন। পরে তাঁকে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় দিয়াওয়ের মাথা ও হাঁটুতে আঘাত লাগে। পরে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক টনি বাউমগার্টনার বলেন, কাচের বোতল দিয়ে কারও মাথায় বারবার আঘাত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ। এতে আরও গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে ক্রিস ব্রাউনের দোষ স্বীকার, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং দাতব্য কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে পাঠানোর প্রয়োজন দেখেননি বিচারক। অতীতে অপরাধের রেকর্ড থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর আইন ভঙ্গের ঘটনা না থাকার বিষয়টিও রায়ে বিবেচনা করা হয়।
আগেও জড়িয়েছেন নানা আইনি জটিলতায়
ক্রিস ব্রাউনের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার সহিংসতা ও অন্যান্য অভিযোগ উঠেছে। ২০০৯ সালে তৎকালীন প্রেমিকা রিহানাকে মারধরের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর থেকেই নানা আইনি জটিলতার মুখে পড়েন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ গঠন করা হয়নি, আবার কিছু অভিযোগ পরে প্রত্যাহার করা হয়।
২০১৯ সালে প্যারিসে ধর্ষণের সন্দেহে তাঁকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তবে পরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
লন্ডনের নৈশক্লাবের হামলার ঘটনায় ক্রিস ব্রাউনের দোষ স্বীকারের পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা হামলা, গুরুতর শারীরিক ক্ষতি করার চেষ্টা এবং অস্ত্র হিসেবে বোতল রাখার অভিযোগ প্রত্যাহার করে সরকারি আইনজীবীরা।
এ ঘটনায় তাঁর বন্ধু ও কণ্ঠসংগীতের প্রশিক্ষক ওমোলোলু আকিনলুলুও দোষ স্বীকার করেন। তাঁকে চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সেই সাজাও স্থগিত রাখা হয়েছে।
সরকারি আইনজীবী হেইডি স্টোনক্লিফ আদালতে বলেন, হামলার ঘটনায় ক্রিস ব্রাউনের ভূমিকা ছিল প্রধান। অন্যদিকে তাঁর আইনজীবী স্যালি বেনেট-জেনকিনস জানান, ঘটনার জন্য ক্রিস ব্রাউন নৈশক্লাবে উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। তাঁর দাবি, পুরো ঘটনাটি ২০ সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হয়নি।
আদালতের বাইরে ভক্তদের ভিড়
রায় ঘোষণার পর আদালতের বাইরে ক্রিস ব্রাউনকে ঘিরে ভক্তদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। ইতালি ও নেদারল্যান্ডস থেকেও কয়েকজন ভক্ত তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। কালো মুখোশ, গাঢ় রঙের চশমা ও কালো পোশাকে আদালতে উপস্থিত হন এই সংগীতশিল্পী। বের হওয়ার সময় ভক্তদের দিকে চুমু ছুড়ে দেন এবং একজনকে অটোগ্রাফও দেন।
তবে ভিড়ের মধ্যে একজনকে সহিংসতা যে গ্রহণযোগ্য নয়, তা তিনি কবে বুঝবেন—এমন মন্তব্য করতেও শোনা যায়।
হামলার ঘটনার পর যুক্তরাজ্য ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ক্রিস ব্রাউন। পরে ২০২৫ সালের মে মাসে একটি সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নিতে ম্যানচেস্টারে গেলে একটি হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ৫০ লাখ পাউন্ড জামিনে মুক্ত ছিলেন তিনি। জামিনের শর্তে গত দুই গ্রীষ্মে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় সংগীত সফরও করতে পেরেছিলেন।
দুইবারের গ্র্যামি জয়ী ক্রিস ব্রাউন
২০০৫ সালে কিশোর বয়সেই সংগীতজগতে পরিচিতি পান ক্রিস ব্রাউন। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় গান ও অ্যালবামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
২০১১ সালে ‘ফেম’ অ্যালবামের জন্য সেরা আরঅ্যান্ডবি অ্যালবাম বিভাগে প্রথম গ্র্যামি পুরস্কার জেতেন এই সংগীতশিল্পী। পরে ২০২৫ সালে ‘১১:১১ (ডিলাক্স)’ অ্যালবামের জন্য একই বিভাগে দ্বিতীয়বার গ্র্যামি অর্জন করেন তিনি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও ব্যক্তিগত জীবন ও আইনি বিতর্ক বারবার আলোচনায় এনেছে ক্রিস ব্রাউনকে। লন্ডনের নৈশক্লাবে হামলার ঘটনায় আদালতের সাম্প্রতিক রায়ও সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
সান নিউজ/ রাব্বি
