নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ, ডিম ও মুরগিসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের মাসিক বাজেট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। একই আয়ে আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য কিনতে পারছেন বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা থেকে একের পর এক পণ্য কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলমান মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বাজারে আসা অনেক ক্রেতার ভাষ্য, আয়ের তুলনায় ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কেউ কেউ সঞ্চয় ভেঙে, আবার অনেকে ধারদেনার মাধ্যমে পরিবার পরিচালনা করছেন।
মাছ, ডিম ও মুরগির দামে নতুন ঊর্ধ্বগতি
সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগি, ডিম এবং বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম আরও বেড়েছে। তবে গরুর মাংসের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকায়, যা সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে ফার্মের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায়। সোনালি মুরগির কেজি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা, হাইব্রিড ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারেও বাড়তি চাপ
মাছের বাজারেও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বর্তমানে জীবিত পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৩১ টাকায়, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা, বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মাঝারি রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। এছাড়া চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল মাছ ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাষের শিং মাছের দাম আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে রূপচাঁদা, নদীর বেলে ও বড় আকারের কিছু দেশীয় মাছ কিনতে গেলে কেজিপ্রতি এক হাজার টাকার বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।
মাংসের বাজার
গরুর মাংসের দাম তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খাসির মাংস কিনতে হলে কেজিপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
কেন বাড়ছে বাজারদর?
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পৌঁছাতে পারছে না। ফলে পাইকারি বাজারেই দাম বেড়ে গেছে এবং সেই প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে। তাদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হয় নিম্নআয়ের মানুষকে। কারণ তাদের মোট আয়ের বড় অংশই খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় হয়। ফলে খাদ্যপণ্যের দামে সামান্য বৃদ্ধি পেলেও তা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বাজার তদারকি আরও কার্যকর করা, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।
এখনও মিলছে না স্বস্তি
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার ইঙ্গিত থাকলেও খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এখনও সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। ফলে বাজারে সীমিত কিছু পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এখনো কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ফিরে আসেনি। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষ।
