এক নজরে বাবুপুর গ্রামের খেলার মাঠ উদ্যোগ :
গ্রামবাসীর উদ্যোগ: টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের প্রায় ৭০০ পরিবারের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ নিজেরা টাকা তুলে (সামর্থ্য অনুযায়ী ২০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত) ৩০ লাখ ৬৮ হাজার টাকা খরচ করে ৬০ শতাংশ জমি কেনেন।
মাঠের উদ্বোধন: গত ২৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামবাসীর কেনা সেই জমিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে খেলার মাঠের শুভ সূচনা করা হয়।
সরকারের সহযোগিতা: সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রকাশের পর যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জেলা প্রশাসক ও ইউএনও-র মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে ওই মাঠের পাশের আরও ৬০ শতাংশ জমি মন্ত্রণালয়ের অর্থে কিনে গ্রামবাসীকে উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আনুষ্ঠানিক ঘোষণা: আগামীকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হবে, যেখানে ডিসি, ইউএনও ও গ্রামের প্রতিনিধিরা আমন্ত্রিত হয়েছেন।
চূড়ান্ত রূপ: গ্রামবাসীর কেনা ৬০ শতাংশ এবং মন্ত্রণালয়ের কেনা ৬০ শতাংশ জমি মিলিয়ে বাবুপুর গ্রামের শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠের পরিসর এখন দ্বিগুণ হতে চলেছে।
শিশু-কিশোরদের ছোট্ট একটু দৌড়ঝাঁপ কিংবা বিকেলে ফুটবল-ক্রিকেট খেলার জন্য চার দেয়ালের খাঁচা থেকে মুক্তি দিতে এক অভাবনীয় ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী কাজ করে দেখিয়েছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের সাধারণ মানুষ।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর আকুতি পেরিয়ে নিজেদের পকেটের কষ্টার্জিত অর্থ জমিয়ে তারা কিনে ফেলেছেন ৬০ শতাংশ জমিও! গ্রামের মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও ঐতিহাসিক ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই তা সরাসরি নজর কেড়েছে নীতিনির্ধারকদের।
আর এই মহৎ কাজের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবার ওই মাঠের ঠিক পাশেই আরও অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ জমি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তহবিল থেকে কিনে গ্রামবাসীকে উপহার দেওয়ার যুগান্তকারী ঘোষণা দিতে চলেছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাত্র সাড়ে তিন হাজার মানুষের জনপদ এই বাবুপুর গ্রামে প্রায় ৭০০টি পরিবারের বসবাস। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে এই এলাকায় শিশু-কিশোর ও তরুণদের আনন্দ-বিনোদনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী খেলার মাঠ ছিল না। ধান কাটার মৌসুম এলে কৃষিজমি কিছুটা ফাঁকা হতো ঠিকই, কিন্তু নতুন করে চাষাবাদ শুরু হলেই চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত সেই সাময়িক খেলার বন্দোবস্ত। তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের এমন করুণ দৃশ্য ব্যথিত করেছিল সবাইকে। এই অসহনীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই কোমর বেঁধে ময়দানে নামার সিদ্ধান্ত নেন গ্রামবাসী।
স্থানীয় ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলম এবং উদ্যোক্তা এস এম ইকবাল মাহমুদের দূরদর্শী নেতৃত্বে পুরো গ্রামজুড়ে একাধিকবার উন্মুক্ত মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শুরু হয় তহবিলে অর্থ সংগ্রহের সেই ঐতিহাসিক লড়াই। বাবুপুরের প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি হয় সাড়ার এক অভূতপূর্ব ঢেউ।
গ্রামের বিত্তশালীদের পাশাপাশি সমাজের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাড়িয়ে দেন সহায়তার হাত। কেউ খুশিমনে দিয়েছেন ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ বা ১ হাজার টাকা। আবার অনেকেই নিজেদের সাধ্যমতো ৫ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দিয়ে তহবিলকে সমৃদ্ধ করেছেন। এর পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জমির মালিক ইকবাল হোসেন সুজন স্বেচ্ছায় দান করেছেন এক শতাংশ মূল্যবান জমি।
বাকি ৫৯ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে কিনতে গ্রামবাসীর মোট খরচ হয়েছে ৩০ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত গত ২৯ অক্টোবর অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সেই জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এলাকাবাসীকে। আকাশে ওড়ানো হয় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা, আর উল্লাসে ফেটে পড়ে গ্রামের খুদে খেলোয়াড়েরা।
গ্রামবাসীর এই সাহসী ও স্বউদ্যোগী সংগ্রামের খবর যখন সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের গোচরীভূত হয়, তিনি আর চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরো প্রকল্পের বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।
খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারেন যে মাঠের ঠিক পাশেই আরও ৬০ শতাংশ খালি জমি রয়েছে, যা কেনা সম্ভব হলে মাঠটি আরও বড় করা যাবে, তখনই তিনি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে সেই জমি কিনে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
আগামীকাল রাজধানীর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আয়োজিত এক বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে এই চমৎকার সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে যাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী। এই ঐতিহাসিক ক্ষণটিকে আরও সুন্দর ও অর্থবহ করতে টাঙ্গাইলের ডিসি, ইউএনও এবং বাবুপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিধি দলকেও বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, খেলার মাঠের মতো একটি জনকল্যাণমূলক বিষয়ের জন্য বাবুপুর গ্রামের সাধারণ মানুষ যেভাবে নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন, তা আমাদের দেশের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনে সত্যিই এক ভিন্ন মাত্রা ও অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সবসময় এই ধরনের ইতিবাচক ও জনমুখী স্বউদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতে এবং উৎসাহ জোগাতে বদ্ধপরিকর।
আগামী প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার এই মহাযজ্ঞে সরকার পাশে থাকতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।
গ্রামবাসীর নিজেদের কেনা ৬০ শতাংশ জমির সঙ্গে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কিনে দেওয়া নতুন আরও ৬০ শতাংশ জমি যখন যুক্ত হবে, তখন বাবুপুরের এই স্বপ্নের খেলার মাঠটির আয়তন এক লাফে দ্বিগুণে রূপ নেবে।
স্থানীয়দের এই সম্মিলিত নিখাদ ভালোবাসার সঙ্গে যখন রাষ্ট্রীয় অভিভাবকত্ব ও সহযোগিতা যুক্ত হয়েছে, তখন বলাই বাহুল্য যে বাবুপুরের আগামী প্রজন্মের দুরন্ত শৈশব ও কৈশোর এক বিশাল পরিসরের স্থায়ী খেলার মাঠ পেতে চলেছে।
সান নিউজ / রাজীব
