দেশব্যাপী হামের সংক্রমণ রোধে সরকারের ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালু থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বরং টিকা কার্যক্রমে শতভাগ কাভারেজ অর্জনের দাবি করা হলেও আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা প্রতিদিনই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বর্তমানে প্রতিদিন হাজারেরও বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণভাবে টিকা নেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু টিকাদানের ছয় থেকে সাত সপ্তাহ পরও সংক্রমণ না কমায় ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা পরিবহনের সময় কোল্ড চেইন (নির্ধারিত তাপমাত্রা) ঠিকভাবে বজায় রাখা হয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রথম ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে টিকা প্রদান করা হয়। সরকারি হিসাবে লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত কাভারেজ অর্জনের দাবি করা হলেও বাস্তবে সংক্রমণ পরিস্থিতি উন্নতি হয়নি।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ বলেন, “কাগজে-কলমে শতভাগ কাভারেজ দেখানো হলেও বাস্তব কাভারেজে ফারাক থাকতে পারে। অনেক এলাকায় প্রকৃত সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়নি। ফলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না, সংক্রমণও কমছে না।”
তিনি আরও বলেন, টিকা দেওয়ার পর শিশুদের শরীরে সত্যিই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে রক্ত পরীক্ষা ও বয়সভিত্তিক গবেষণা জরুরি হলেও সরকার এ বিষয়ে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেয়নি।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী। তিনি বলেন, “শুধু টিকা দিলেই কাজ শেষ হয় না। টিকার পর কতটুকু অ্যান্টিবডি তৈরি হলো, তা পরীক্ষা করা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টি বললেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।”
তার মতে, টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় না থাকলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে। ফলে শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি নাও হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস পরও দেশে হামের সংক্রমণ কমছে না। প্রতিদিন নতুন করে হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক জানান, টিকা গ্রহণের পর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে কি না—এ বিষয়ে এখনো কোনো পৃথক পরীক্ষা করা হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, নতুন করে শতাধিক আক্রান্ত শনাক্ত এবং একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর গবেষণা, কোল্ড চেইন যাচাই এবং টিকার প্রকৃত কার্যকারিতা পরীক্ষা না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
