এক নজরে দুই উইঘুর মুসলিমের বর্তমান অবস্থা :
| বিষয় | বিবরণ |
|
সংকটগ্রস্ত ব্যক্তি
|
থাইল্যান্ডে বন্দি থাকা দুই উইঘুর মুসলিম (যাদের একজনের বয়স আটকের সময় ১৪ বছর ছিল)
|
|
বন্দিদশার মেয়াদ
|
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে (২০১৪ সাল থেকে থাই কর্তৃপক্ষের হেফাজতে)
|
|
বর্তমান অবস্থান
|
ব্যাংককের সুয়ান প্লু ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টার (সম্প্রতি কারাগার থেকে স্থানান্তরিত)
|
|
প্রধান ঝুঁকি
|
চীনে ফেরত পাঠানো হলে বলপূর্বক অন্তর্ধান, গুম এবং মারাত্মক নির্যাতনের চরম আশঙ্কা
|
|
চীনা প্রশাসনের ভূমিকা
|
গত আগস্টে ব্যাংককস্থ চীনা দূতাবাস তাদের হস্তান্তরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে
|
|
মানবাধিকার সংগঠনের দাবি
|
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর পক্ষ থেকে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বন্ধ করে নিরাপদ কোনো তৃতীয় দেশে পাঠানোর আহ্বান
|
|
আইনি অবস্থান ও বাধা
|
বন্দিরা চীনে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আইনজীবীদের মাধ্যমে লিখিত আপত্তি জানালেও, ইউএনএইচসিআর-এর প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান করেছে থাই ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ
|
প্রায় এক যুগ ধরে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি থাকার পর অবশেষে মুক্তির আলো দেখেছিলেন দুই উইঘুর মুসলিম। কিন্তু সেই স্বস্তি মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে এক দুঃস্বপ্নে। বেইজিংয়ের হাতে সঁপে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পেরে থাই কর্তৃপক্ষের কাছে জীবনভিক্ষা চেয়েছেন তারা। যেকোনো মূল্যে চীনমুখী প্রত্যাবাসন রোধে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে তীব্র কূটনৈতিক ও মানবিক চাপ। একদিকে দুই উইঘুর মুসলিমের জীবন ঝুঁকির মুখে অন্যদিকে থাই কর্তৃপক্ষের ওপর প্রবল চাপ বেইজিংয়ের ।
দশকের পর দশক ধরে বন্দিদশা ও মুক্তির পেছনের শঙ্কা :
ঘটনার শুরু প্রায় এক দশক আগের। ২০১৪ সালে ভাগ্য ও আশ্রয়ের খোঁজে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমানোর পরই থাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন ওই দুই উইঘুর নাগরিক। আটকের সময় তাদের একজনের বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর—কিশোর বয়সের দুরন্ত দিনগুলো যাদের কেটেছে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর।
২০২০ সালের শুরুর দিকে ইমিগ্রেশন ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসার দুঃসাহসী এক প্রচেষ্টার জেরে তাদের ওপর নেমে আসে জেলখানার খড়্গ। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে নির্ধারিত সাত বছরের কারাদণ্ডের প্রায় পুরোটাই তাদের কাটাতে হয় কুখ্যাত কারাব্যবস্থার মাঝে।
সম্প্রতি রাজকীয় ক্ষমার সুবাদে কারাগার থেকে মুক্তি মিললেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত মেলেনি। গত একুশ অক্টোবর কারাগার থেকে সোজা ব্যাংককের সুয়ান প্লু ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে তাদের। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোরালো দাবি, এই স্থানান্তরটি মূলত বেইজিংয়ের রক্তচক্ষুর কাছে নতি স্বীকার করে তাদের চীনে ফেরত পাঠানোর এক সুদূরপ্রসারী নীল নকশা।
বেইজিংয়ের গোপন হাতছানি ও আন্তর্জাতিক মহলের চরম উদ্বেগ :
উইঘুর দুই পুরুষকে যেকোনো মূল্যে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে চীনা প্রশাসন। গত আগস্ট মাসেই ব্যাংককস্থ চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সংসদীয় কমিটির কাছে তাদের হাতে হস্তান্তরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে জোরেশোরে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের শীর্ষ কর্মকর্তা এলেন পেয়ারসন থাইল্যান্ড সরকারের পূর্বের কলঙ্কজনক অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
অতীতে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন সরকার বেইজিংয়ের অযৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে বহু উইঘুরকে চীনে ফেরত পাঠিয়েছিল, যাদের পরবর্তীতে চিরতরে গুম বা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের প্রশাসনের প্রতি কড়া বার্তা দিয়ে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, জোরপূর্বক এই মানবতাবিরোধী প্রত্যাবাসন অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
একই সঙ্গে ওই দুই উইঘুর নাগরিককে তৃতীয় কোনো নিরাপদ দেশে পাড়ি জমানোর সুযোগ করে দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
আইনি লড়াই ও জাতিসংঘের প্রবেশাধিকার নিয়ে ধোঁয়াশা :
থাইল্যান্ডের বর্তমান কঠোর অভিবাসন নীতি অনুযায়ী, কোনো আটক ব্যক্তি যদি লিখিতভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার বিপরীতে আপত্তি না জানান এবং তৃতীয় কোনো রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে না আসে, তবে তাদের বেইজিংয়ের খাঁচায় ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের আর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে না।
তবে আশার কথা হলো, ভুক্তভোগী ওই দুই উইঘুরের আইনি প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে থাই প্রশাসনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা স্বেচ্ছায় তো দূরের কথা, জোর করলেও চীনে পা রাখতে রাজি নন।
নির্যাতন ও চরম নিপীড়নের ভয়ে তারা বারবার মৃত্যুর মুখে না পড়ার আকুতি জানাচ্ছেন। এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে থাই ইমিগ্রেশনের একগুঁয়ে আচরণ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধিরা বারবার ওই দুই উইঘুরের সঙ্গে দেখা করে তাদের শরণার্থী মর্যাদা যাচাই করার আবেদন জানালেও থাই কর্তৃপক্ষ তা শক্তহাতে প্রত্যাখ্যান করে চলেছে।
থাইল্যান্ডের এই ডিটেনশন ক্যাম্পের চার দেয়ালের ভেতরে এখন এক মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয় ঘটার উপক্রম হয়েছে, যার দিকে তাকিয়ে রয়েছে পুরো বিশ্ববিবেক।
সান নিউজ / রাজীব
