গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত পৃথক সহিংস ঘটনায় বিএনপি ও দলটির সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩৮ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ, পুরোনো শত্রুতা, চাঁদাবাজি, দখলসংক্রান্ত বিরোধ এবং অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থের মতো বিষয়গুলোকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করছে। একই সময়ে দেশে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৯১টি হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত নিহত বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের ৩৮ নেতাকর্মীর মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং তাঁতী দলের একজন রয়েছেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে রাজধানীর কাফরুলে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ নিহত হওয়ার ঘটনা আলোচনায় আসে। ২৪ জুলাই রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি নিহত হন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন বলে জানা গেছে।
ঘটনাস্থলের হামলায় যুবদলের আরও এক কর্মী এবং এক সবজি বিক্রেতা আহত হন। পুলিশি তদন্তে জানা যায়, কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, এ উদ্দেশ্যে ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে অর্থের বিনিময়ে অস্ত্রধারীদের আনা হয়। তবে হামলার সময় গুলির লক্ষ্য পরিবর্তিত হওয়ায় যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ নিহত হন।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ময়লা ব্যবস্থাপনার ঠিকাদারি, ফুটপাতের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং টিনশেড ঘরের দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হামলার পরিকল্পনা হতে পারে।
এ ঘটনায় কাফরুল থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) যৌথ অভিযান চালিয়ে ভাড়াটে হামলাকারীসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এর আগে ২১ জুলাই রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহিম পলাশ হত্যার ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় তিনি নিহত হন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এ হামলা চালানো হতে পারে। এ ঘটনায় কয়েকজন যুবদল নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে আসে।
এদিকে ১৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির স্থগিত হওয়া সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ভাড়াটে অপরাধীদের ব্যবহার করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ৮ জুন রাজধানীর মৌচাক এলাকায় রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত বিরোধকে এ ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বিএনপি কর্মী রাজু আহম্মেদ, চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী, খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহে বিএনপি কর্মী রানা মিয়া এবং বাগেরহাটে কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লের মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৬ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত হয়েছেন চার হাজারের বেশি মানুষ।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের সহিংসতার বড় অংশই রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং পারস্পরিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। ৬১০টি ঘটনার মধ্যে ৫৭৩টি ঘটনায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষের বিষয় উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, এসব ঘটনায় নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতের চারজন, আওয়ামী লীগের একজন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তিনজন রয়েছেন। একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ থেকে সংঘটিত ১৯৪টি ঘটনায় ১ হাজার ৫৮৫ জন আহত এবং ২৪ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে সাতজন এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘাতে তিনজন নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনায় ২ হাজার ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬০০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় সন্ত্রাসী চক্রের হামলার শিকার হচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। তিনি এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে অভিযুক্তদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার মতে, বেশিরভাগ ঘটনার পেছনে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, ময়লা ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাতের ব্যবসা, জমি বা স্থাপনা দখল এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরোধ কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনে বাইরের এলাকা থেকে ভাড়াটে হামলাকারী আনার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মতে, অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতার প্রবণতা বাড়ছে। তিনি বলেন, ফুটপাত, পরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দখলকেন্দ্রিক ব্যবসার অবৈধ নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করা জরুরি। তা না হলে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং জনমনে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।
