রাশিয়ার অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সামরিক দিক থেকে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যাওয়ায় দেশটির আকাশ সুরক্ষার মূল প্রতিরক্ষা প্রাচীর এখন হুমকির মুখে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ এবং সামরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তিগত বাধার কারণে কিয়েভের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ফুরিয়ে গেছে প্যাট্রিয়টের শেষ মজুত
সিএনএনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মারাত্মক ঘাটতির কারণে ইউক্রেন সাম্প্রতিক রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো সফলভাবে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ সীমিত হওয়ার কারণে প্যাট্রিয়টের এই ইন্টারসেপ্টরগুলোর পর্যাপ্ত ভাণ্ডার গড়ে তোলা কিয়েভের জন্য সবসময়ই কঠিন ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত চালানো রুশ হামলায় কিয়েভের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খারকিভের জ্বালানি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই হামলায় চারজন প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ আহত হন। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী অল্প কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম হলেও, এই লড়াইয়ে তাদের হাতে থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের শেষ মজুতটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেছে।
ওয়াশিংটন-কিয়েভ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও জেলেনস্কির হতাশা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যকার সম্পর্ক দিন দিন আরও শীতল হয়ে পড়ছে। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলা বন্ধ করার জন্য কিয়েভের ওপর জোরালো চাপ সৃষ্টি করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে কিয়েভের যুক্তি হলো—রাশিয়া যখন নির্বিচারে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে চলেছে, তখন একতরফাভাবে পাল্টা আক্রমণ বন্ধ করা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত হতে পারে না।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি গত আগস্টেই জানিয়েছিলেন যে তার দেশের হাতে চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে। কিয়েভ নিজ দেশে প্যাট্রিয়ট উৎপাদনের লাইসেন্স পাওয়ার চেষ্টা করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাতে সায় দেননি। এরপরও আন্তর্জাতিক মহলে ও মার্কিন নেতৃত্বের কাছে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তার আবেদন জানিয়ে যাচ্ছেন জেলেনস্কি। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর মাধ্যমে অস্ত্র ক্রয় সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করার মতো কঠোর হুঁশিয়ারিও এসেছে।
যোগাযোগব্যবস্থায় স্টারশিল্ডের নতুন জটিলতা
ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পাশাপাশি ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের সামরিক যোগাযোগ সংস্করণ 'স্টারশিল্ড' নিয়েও বড় ধরনের বেকায়দায় পড়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। সম্প্রতি এই ব্যবস্থার গতি ও কার্যকারিতা সীমিত করায় ইউক্রেনের সামরিক অভিযান পরিচালনা, রসদ সরবরাহ এবং রুশ ড্রোন প্রতিহত করার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের অভিযোগ, স্টারলিংক নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটায় তাদের বেশ কিছু আক্রমণকারী ড্রোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে এর কার্যক্রম আংশিকভাবে সচল হয়েছে, তবুও সম্পূর্ণ সংকট কাটেনি। ইলন মাস্ক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন সরকার ও সামরিক বাহিনীর নির্দেশেই এই প্ল্যাটফর্মের গতি বা ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার এখতিয়ার তাদের রয়েছে।
প্রতিরক্ষার মূল অস্ত্র প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের শুন্যতা, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা—এই তিনের যাঁতাকলে পড়ে ইউক্রেনের যুদ্ধজয়ের কৌশল ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এখন সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি।
সান নিউজ / রাজীব
