বুথফেরত ফলের আভাস সত্যি হল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির গেরুয়া সুনামিতে ভেসে গেল তৃণমূল কংগ্রেসের নীল দুর্গ। এমনকি হারলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের লাগোয়া ভারতের এই রাজ্যে মমতার দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটল। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে প্রথমবারের মতো রাজ্য চালানোর ভার দিল পশ্চিমবঙ্গবাসী।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হয়। তাতে রেকর্ড ৯৩ শতাংশ ভোট পড়ে, যা নিয়ে নানা কথা হয়েছে।
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম কেটে দেওয়ার ঘটনাও কম সন্দেহ জাগায়নি। পশ্চিমবঙ্গ জিতে নিতে নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি কতটা মরিয়া, ভোটার তালিকা সংশোধনের ওই প্রক্রিয়াকে তার নমুনা হিসেবে দেখিয়েছে মমতার দল তৃণমূল।
অনিয়মের অভিযোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করেছিল নির্বাচন কমিশন। সে কারণে সোমবার (৪ মে) ২৯৩ আসনের ফল ঘোষণা করা হয়। তাতে বিজেপি পেয়েছে ২০৬ আসন। আর মাত্র ৮১টি আসনে জিতে ভরাডুবির মুখে পড়তে হয়েছে তৃণমূল সংগ্রেসকে।
এর আগের বিধানসভা নির্বাচনে ২০২১ সালে তৃণমূলের আসন ছিল ২১৪টি। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে ১৩৩টি আসন তারা এবার খুইয়েছে। এমনকি দলের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার নিজের আসনেও হেরেছেন। হেরে গেছেন তার সরকারের অন্তত ১৭ জন মন্ত্রী।
অন্যদিকে ২০২১ সালে মাত্র ৭৭ আসন পাওয়া বিজেপির ঘরে এবার যোগ হয়েছে ১২৯টি আসন। সব মিলিয়ে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনের জয়ে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে বিপুল শক্তি নিয়ে।
এছাড়া কংগ্রেস দুটি, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি দুটি সিপিআইএম একটি এবং অল ইনডিয়া সেকুলার ফ্রন্ট একটি আসনে জয় পেয়েছে।
সোমবার সকালে ভোট গণনা শুরুর পর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাস এবার মিলে যেতে চলেছে। দুপুরের পর থেকেই বিজেপি অফিসের সামনে শুরু হয়ে যায় উৎসব আর উদযাপন।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৪৭ আসন। রাত ৯টার আগে আগে বিজেপি সেই দাগ পেরিয়ে যেতেই উল্লাসে ফেটে পড়েন বিজেপিকর্মীরা। গেরুয়া আবির উড়িয়ে ‘জয় শ্রীরাম’স্লোগান দিতে থাকেন তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজ্য বিজেপি বার্তা দেয় ‘খেলা শেষ’।
২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচনের আগে তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন; যা পরে ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ও একাধিকবার এ স্লোগান ব্যবহার করেন। এবার সেই স্লোগানকে কটাক্ষ করে বিজেপি মমতার ‘খেলা শেষ’ হওয়ার বার্তা দিল।
তবে পরাজয় স্বীকার করতে রাজি নন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। বিজেপির বিরুদ্ধে ফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ১০০টির বেশি আসন লুট হয়েছে। এটা কী ধরনের জয়! এটা ইমমোরাল ভিক্ট্রি। মোরাল ভিক্ট্রি নয়। পুরোটাই বেআইনি। জোর করে জিতেছে। লুট, লুট, লুট। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই।
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে ফিরে এসেছে সিই ‘অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ’ স্লোগান। বিহার, ওড়িশার মতো পশ্চিমবঙ্গের মানুষও বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের ওপর ভরসা রাখায় কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
দিল্লিতে বিজেপি সদর দপ্তরে নরেন্দ্র মোদি দলের বিজয় উদযাপন মঞ্চে ওঠেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির প্রিয় পোশাক ধুতি পাঞ্জাবি পরে। তিনি বলেন, গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর, সর্বত্র পদ্ম ফুটেছে।
তার ভাষায়, বাংলায় পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আজ থেকে বাংলা ভয়মুক্ত হল। বাংলায় রাজনৈতিক হিংসায় অনেক জীবন নষ্ট হয়েছে, এবার বদলা নয়, বদল।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর বলছে, আগামী ২৫ বৈশাখ (৯ মে) কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অষ্টাদশ বিধানসভার শপথগ্রহণ হবে রাজভবনে।
বিবিসি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে এক বড় ব্যতিক্রম হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি বলছে, মোদির দল বিজেপি ভারতের হিন্দিভাষী বলয় জুড়ে জয়জয়কার করেছে, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতে নিজেদের বিস্তার ঘটিয়েছে এবং একসময়ের প্রতাপশালী আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করেছে। তবু সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার আত্মপরিচয়ে মগ্ন পশ্চিমবঙ্গ অটলভাবে তাদের প্রতিরোধ ধরে রেখেছিল।
১০ কোটির বেশি মানুষের পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের সংখ্যা জার্মানির চেয়েও বেশি; যা এই নির্বাচনকে ভারতের সাধারণ কোনো রাজ্য পর্যায়ের ভোটের চেয়ে জাতীয় নির্বাচনের মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ দেড় দশক পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা দলের কর্তৃত্বে এল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। এনডিটিভির বিশ্লেষণ বলছে, ভোটের এই ফলাফল ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এবং অবকাঠামো নির্মাণের মতো দলটির গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
সাননিউজ/আরএ
