পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের (পিটিআই) শক্ত ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম স্থগিত করার মাধ্যমে দেশটির রাজনৈতিক সংকট এক নতুন ও নাটকীয় মোড় নিয়েছে।
কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলা তীব্র আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে আরও মারাত্মক অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা জাগিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই সংকটের নানা দিক ও এর সম্ভাব্য পরিণতি উঠে এসেছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় দমনপীড়ন ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতি : প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারসহ বিভিন্ন এলাকায় কনটেইনার বসিয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, ইন্টারনেট আংশিক বন্ধ রাখা এবং সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পিটিআইয়ের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে চলে গেছেন এবং বিক্ষোভের নেতৃত্বদানকারী মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যদিও কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন যে পিটিআই প্রশাসন সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁাতাত করেছিল এবং এই পদক্ষেপের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই, তবে সরকার এই দাবির সপক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
জরুরি অবস্থা জারির নেপথ্য রসায়ন : বিশ্লেষকদের মতে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় হঠাৎ জরুরি অবস্থা জারির সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত ১৩ বছর ধরে এই প্রদেশে ক্ষমতায় থাকা পিটিআইয়ের নেতাকর্মীরা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে দীর্ঘ পদযাত্রা ও বিক্ষোভ চালিয়ে আসছিলেন।
চ্যাথাম হাউসের গবেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররাও মনে করেন, এর সঙ্গে সন্ত্রাস দমনের বাস্তব কোনো যোগসূত্র নেই; বরং বিরোধী দলের হাতে একটি প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ থাকা কেন্দ্র ও প্রভাবশালী সামরিক কর্তৃপক্ষ আর মেনে নিতে পারছে না।
দুর্বল পিটিআই ও সামরিক বাহিনীর কৌশলী অবস্থান : প্রায় তিন বছর ধরে কারাবন্দী থাকা ইমরান খানের দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের ক্ষোভ ও চাপ কমাতেই সামরিক সমর্থিত সরকার এই কঠোর বার্তা দিচ্ছে বলে মত দিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষকরা।
অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যের পুরোটাই সামরিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান কিছুটা অনুকূলে থাকায় পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব এখন সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নীতি বেছে নিয়েছে।
বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের চরম ঝুঁকি : বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান পদক্ষেপটি হিতে বিপরীত হতে পারে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার মধ্যবর্তী বাফার বা স্থানীয় সরকার বাদ দিয়ে ইসলামাবাদ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সব দায় এখন সরাসরি কেন্দ্রের ওপর বর্তাবে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ সূচকে শীর্ষে থাকা পাকিস্তানে জঙ্গিবাদ দমন এবং আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি হুতি সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তানের ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের এই সংস্কৃতি এবং চোখের সামনে একটি ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেনা ইতিহাস পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সান নিউজ / রাজীব
