দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গাজা উপত্যকায় অবিরাম সামরিক অভিযান এবং ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের বর্ষপূর্তির পর দেশটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত পার্লামেন্টারি (নেসেট) নির্বাচন। এই নির্বাচনের ফলাফলেই নির্ধারিত হবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা এই ডানপন্থী নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
বিশ্বজুড়ে প্রবল কূটনৈতিক চাপ এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের 'গণভোট' হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ চাপ
২০২৩ সালের অক্টোবরে মুক্তিকামী সংগঠন হামাসের নজিরবিহীন অভিযানের পর থেকেই গাজায় বিধ্বংসী যুদ্ধ পরিচালনা করে আসছেন নেতানিয়াহু। পরবর্তীতে তা বিস্তৃত হয় ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক মুখোমুখি অবস্থানে, যেখানে যুক্ত হয় ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও।
এই দুই প্রান্তিক সামরিক সংঘাত যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে একঘরে করে তুলেছে, তেমনই দেশের অভ্যন্তরেও নেতানিয়াহুর নীতি নিয়ে তীব্র মেরুকরণ তৈরি করেছে। তবুও দীর্ঘ অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কৌশল এবং যুদ্ধকালীন কঠিন নেতৃত্বের ভাবমূর্তি পুঁজি করেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইছেন তিনি।
প্রধান দুই পরাশক্তি ও রাজনৈতিক জোট
ইসরায়েলের নির্বাচনী লড়াই প্রধানত দুটি প্রধান শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে:
নেতানিয়াহুর ডানপন্থী-ধর্মীয় জোট:
মূল দল: লিকুদ পার্টি।
প্রধান শরিক: উগ্র ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভিরের 'জিউইশ পাওয়ার' ও বেজালেল স্মোত্রিচের 'রিলিজিউজ জায়োনিজম'। ফিলিস্তিনবিরোধী চরম অবস্থান ও সহিংসতায় উসকানির অভিযোগে এদের শীর্ষ নেতাদের অনেকের ওপরই পশ্চিমাদের নানা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বিরোধী জোট:
নেতৃত্বে: সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান গাদি আইজেনকটের দল 'ইয়াশার'।
অন্যান্য দল: টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু এবং ডেমোক্র্যাটস।
প্রধান মুখ: মধ্যপন্থী ও ডানপন্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য গাদি আইজেনকট এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট।
প্রচারণার মূল অস্ত্র: ট্রাম্প কার্ড বনাম নিরাপত্তা ব্যর্থতা
নির্বাচনী প্রচারণায় নেতানিয়াহু মূলত দুটি কৌশল সামনে এনেছেন—প্রথমত, সংকটকালে নিজের সামরিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব; দ্বিতীয়ত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। নেতানিয়াহুর দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হুমকি চিরতরে নস্যাৎ করতে ট্রাম্পের যে পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নে তাঁর ক্ষমতায় থাকা অপরিহার্য।
অন্যদিকে, বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট একে ‘ভীতি প্রদর্শন ও ভিত্তিহীন মিথ্যাচার’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলে যে সরকারই আসুক না কেন, ওয়াশিংটন সব সময় ইসরায়েলি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গেই সহযোগিতা বজায় রাখবে। বিরোধীরা মূলত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের মারাত্মক গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহু সরকারকেই দায়ী করে ভোট চাইছেন।
নির্বাচন পদ্ধতি ও আসন সমীকরণ
ইসরায়েলের নেসেট নির্বাচনে দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়:
মোট আসন সংখ্যা: ১২০টি।
সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় একক সংখ্যা: ৬১টি আসন।
ভোটার সংখ্যা: প্রায় ৭৩ লাখ।
ন্যূনতম ভোট হার (Threshold): নেসেটে আসন পেতে প্রতিটি দলকে অন্তত ৩.২৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও ঝুলন্ত পার্লামেন্টের শঙ্কা
জনমত জরিপগুলোর তথ্য অনুযায়ী, লড়াই হতে চলেছে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে তৈরি হতে পারে রাজনৈতিক অচলাবস্থা।
যদি কোনো জোট সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনে পৌঁছাতে না পারে, তবে নেতানিয়াহুকেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান হিসেবে রেখে পরবর্তী বছরে আবারও আগাম নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে পুরো দেশকে।
সমাজ ও রাজনীতিতে তীব্র বিভাজনের এই সময়ে ইসরায়েলি নাগরিকরা ঠিক কোন পথে হাঁটবেন, তার উত্তর মিলবে আজকের ভোটের ফলাফলেই।
সান নিউজ / রাজীব
