স্ট্রেস বা মানসিক চাপ জীবনের স্বাভাবিক একটি অংশ। অনেক ক্ষেত্রে এটি মানুষকে কাজের প্রতি মনোযোগী হতে এবং সফলতার পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। তবে দীর্ঘদিনের বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নষ্ট হতে পারে সম্পর্ক, তৈরি হতে পারে একাকিত্ব; পাশাপাশি দেখা দিতে পারে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যেক মানুষের স্ট্রেসের কারণ বা ‘ট্রিগার’ আলাদা। তবে কিছু বিষয় অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই মানসিক চাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
কর্মক্ষেত্রে চাপ
জরিপ অনুযায়ী, কাজের চাপ মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ। নিজের কাজ নিয়ে অসন্তুষ্টি, অতিরিক্ত দায়িত্ব কিংবা দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে অনেকের মধ্যে স্ট্রেস তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া দুর্বল ব্যবস্থাপনা, কাজের দায়িত্ব ও প্রত্যাশা স্পষ্ট না থাকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিলতাও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করা, পদোন্নতি বা অগ্রগতির সুযোগ না থাকা এবং বৈষম্য বা হয়রানির শিকার হওয়াও কর্মীদের মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।
জীবনের বড় পরিবর্তন
জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। প্রিয়জনের মৃত্যু, সন্তানের জন্ম, বিবাহবিচ্ছেদ, চাকরি হারানো, আর্থিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি, বিয়ে কিংবা নতুন বাড়িতে চলে যাওয়ার মতো ঘটনাও স্ট্রেস তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, রাগ, দুঃখ, অপরাধবোধ ও কম আত্মসম্মানও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
আঘাতমূলক ঘটনা
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চুরি, ধর্ষণ কিংবা নিজের বা প্রিয়জনের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো আঘাতমূলক ঘটনা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। এসব ঘটনার স্মৃতি বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাও অনেক সময় চাপের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
ভয় ও অনিশ্চয়তা
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় ও অনিশ্চয়তাও মানসিক চাপের অন্যতম কারণ। নিয়মিত সন্ত্রাসী হামলা, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কিংবা বিষাক্ত রাসায়নিকের হুমকি নিয়ে সংবাদ শুনতে থাকলে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এসব পরিস্থিতির ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই—এমন অনুভূতি চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আর্থিক সংকটও মানসিক চাপের বড় কারণ। মাস শেষে বিভিন্ন বিল পরিশোধের চিন্তা, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার ব্যয় কিংবা অন্যান্য আর্থিক দায়বদ্ধতা একজন মানুষকে ক্রমাগত চাপের মধ্যে রাখতে পারে।
অবাস্তব প্রত্যাশা
নিজের কাছ থেকে সবসময় নিখুঁত ফলাফল আশা করাও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। কোনো কিছু প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হয়। তাই জীবনে সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাকেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি।
সুখকর পরিবর্তনও হতে পারে চাপের কারণ
জীবনের সব পরিবর্তন নেতিবাচক নয়। তবে বড় ধরনের যেকোনো পরিবর্তনই মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিয়ে, নতুন চাকরি বা পদোন্নতির মতো সুখকর ঘটনাও নতুন দায়িত্ব ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কারণে স্ট্রেস তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিবাহবিচ্ছেদ, বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি কিংবা পরিবারের কারও মৃত্যু আরও তীব্র মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।
ব্যক্তি ভেদে চাপ সামলানোর ক্ষমতা ভিন্ন
একই পরিস্থিতিতে সবাই সমান মাত্রার মানসিক চাপ অনুভব করেন না। ব্যক্তিত্ব, পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং মানসিক সহ্যক্ষমতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে একজন ব্যক্তি কতটা চাপ সামলাতে পারবেন।
কেউ জীবনের কঠিন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে মানসিক চাপ সামলে এগিয়ে যেতে পারেন। আবার কেউ সামান্য চাপেও ভেঙে পড়তে পারেন এবং নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ মনে করতে পারেন।
তাই মানসিক চাপের কারণগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি নিজের অনুভূতি ও মানসিক অবস্থার প্রতিও সচেতন থাকা জরুরি।
সান নিউজ/ জামান
