বাংলাদেশের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার শুধু পর্যটনের জন্যই নয়, মূল্যবান খনিজ সম্পদের কারণেও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহন করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সৈকতের বালুর নিচে লুকিয়ে রয়েছে জিরকনসহ একাধিক বিরল ভারী খনিজ, যার অর্থনৈতিক মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এসব সম্পদ কার্যকরভাবে উত্তোলন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের উদ্যোগ না থাকায় বিপুল সম্ভাবনা এখনো অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে।
১৭টি স্থানে মূল্যবান খনিজের সন্ধান
গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭টি স্থানে ভারী খনিজের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি খনিজভান্ডার কক্সবাজার জেলায় এবং বাকি দুটি নিঝুম দ্বীপ ও কুয়াকাটা এলাকায় অবস্থিত।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমানে প্রচলিত মজুতের হিসাব বহু বছর আগের জরিপের ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন করে অনুসন্ধান চালানো হলে প্রকৃত মজুত আরও অনেক বেশি হতে পারে।
শুধু জিরকন নয়, রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ
গবেষণায় উঠে এসেছে, উপকূলীয় বালুতে জিরকনের পাশাপাশি ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট এবং মোনাজাইটের মতো মূল্যবান ভারী খনিজও রয়েছে।
এসব খনিজ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে জিরকন থেকে উৎপাদিত জিরকোনিয়াম ব্যবহৃত হয়—
মহাকাশ প্রযুক্তিতে
জেট ইঞ্জিন তৈরিতে
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে
আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে
ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে
প্রতিরক্ষা খাতে
উচ্চমানের সিরামিক ও রিফ্র্যাক্টরি শিল্পে
বিশ্ববাজারে এসব খনিজের চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানের বিশুদ্ধতা
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সংগৃহীত জিরকনের বিশুদ্ধতার হার প্রায় ৯৬ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এই খনিজ রপ্তানির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চমানের এই খনিজ দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
পুরোনো জরিপ, নতুন মূল্যায়নের দাবি
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বর্তমানে যে মজুতের হিসাব প্রচলিত রয়েছে, তা কয়েক দশক আগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ১৯৮০-এর দশকের পর এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক জরিপ হয়নি।
ফলে বর্তমানে প্রকৃত মজুত কত, তা নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব হয়নি। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমগ্র উপকূলীয় এলাকায় পুনরায় অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিনিয়োগে আগ্রহ থাকলেও হয়নি অগ্রগতি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতীতে বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং দেশীয় বেসরকারি কোম্পানি এই খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে বাণিজ্যিকভাবে খনিজ উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে সম্ভাবনাময় এই খাত আজও কার্যকর উন্নয়নের বাইরে রয়ে গেছে।
খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্র কার্যত অচল
কক্সবাজারের খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্র বর্তমানে প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি অকেজো এবং জনবল সংকটও প্রকট।
যেখানে প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য কাঠামো রয়েছে, সেখানে বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকজন কর্মী দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে খনিজ উত্তোলন করা গেলে বাংলাদেশ একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে, অন্যদিকে নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এছাড়া উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে দেশের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করা সম্ভব হলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পখাত আরও শক্তিশালী হবে।
ভবিষ্যতের করণীয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কক্সবাজার উপকূলের খনিজ সম্পদকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে নতুন জরিপ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে বাণিজ্যিক উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
