দীর্ঘ ৩২ বছর পর দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৪ সালের ১১৭টি ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের শুরুতে তা ২৯৭টিতে উন্নীত করে। একই সময়ে ওষুধের দাম নির্ধারণে নতুন একটি পদ্ধতিও চালু করা হয়।
কিন্তু সেই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। এর ফলে আপাতত আবারও কার্যকর থাকছে ১৯৯৪ সালের পুরোনো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা।
গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করে। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রচলিত আইন অনুসারে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বিধান রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত তালিকায় সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
তবে সরকারের এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য ও ওষুধ বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। তাদের বক্তব্য, কোনো প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকলে সেটি সংশোধন করে নতুন তালিকাকে আরও কার্যকর করা যেত। পুরো তালিকা বাতিল করে তিন দশক আগের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের ওষুধপ্রাপ্তি ও চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের নতুন তালিকা প্রণয়নের সময় জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি। এ কারণে আইনগত ও প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় তালিকাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকার অবশ্য জানিয়েছে, বিষয়টি এখানেই থেমে থাকছে না। নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা হবে। পাশাপাশি ওষুধের দাম নির্ধারণের বিষয়টিও নতুন প্রক্রিয়ার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নতুন তালিকার বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট বিচারাধীন থাকার বিষয়টিও সরকারের ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে।
১৯৯৪ সালে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ১১৭টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে তালিকায় কিছু পরিবর্তন আনা হলেও ২০২৬ সালের আগে বড় পরিসরে এর আধুনিকায়ন হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২৯৭টি ওষুধের নতুন তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, নতুন রোগের চিকিৎসা, ওষুধের আধুনিক ব্যবহার এবং রোগীদের পরিবর্তিত চিকিৎসা চাহিদাকে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু তালিকাটি প্রকাশের পর থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল ওষুধশিল্পের একটি অংশ। পরবর্তীতে তালিকার বৈধতা নিয়েও আইনি প্রশ্ন ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ও জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ড. জাকির আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, ১৯৯৪ সালের তালিকাকে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা জরুরি ছিল।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধ উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ফলে দীর্ঘদিন আগের তালিকা অপরিবর্তিত রেখে বর্তমান স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, ওষুধের দাম ও তালিকা নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য একটি কার্যকর ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে দীর্ঘ সময়েও এমন স্থায়ী ব্যবস্থা যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি।
অধ্যাপক জাকির আহমেদের দাবি, জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পরও এ বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও পরিষদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ করা হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন মনে করেন, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে নতুন তালিকা বাতিলের যুক্তি যথেষ্ট নয়। তার মতে, প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তালিকাটি পুনর্মূল্যায়ন করা যেত।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের তালিকা তৈরিতে যদি উপদেষ্টা পরিষদের মতামত নেওয়া না হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমান সরকার কেন সেই ভুল সংশোধনের পথে গেল না?
তার বক্তব্য, নতুন তালিকা পুরোপুরি বাতিল করে পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন করা অধিক কার্যকর হতে পারত।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানের মতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা শুধু প্রশাসনিক বা আইনি কাঠামোর বিষয় নয়; এটি সরাসরি চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, গত ৩০ বছরে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। নতুন নতুন ওষুধ, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং উৎপাদন প্রযুক্তিও যুক্ত হয়েছে।
তার দাবি, ১৯৯৩-৯৪ সালের তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৩০টির মতো ওষুধ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। কিছু স্যালাইন ও প্রতিষেধকও ওই ব্যবস্থার সঙ্গে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ অবস্থায় পুরোনো তালিকাকে সরাসরি পুনর্বহাল করার পরিবর্তে বর্তমান চিকিৎসা বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন তালিকা তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আকতার হোসেনের মতে, তিন দশক আগের ১১৭টি ওষুধের তালিকা বর্তমান সময়ের সব ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়।
তার মতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এমনভাবে তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে রোগীর প্রয়োজন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং ওষুধের যৌক্তিক মূল্য—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় থাকে।
তিনি আরও বলেন, একই জেনেরিকের বিভিন্ন ব্র্যান্ড বাজারে থাকলেও ওষুধের উপাদান ও মান বজায় রাখা এবং যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দরকার। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা থাকলে ভোক্তা ও ওষুধশিল্প—উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সুফিয়ান নাহিন শিমুল মনে করেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রোগীদের ওপর পড়তে পারে।
তার মতে, ওষুধের যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করতে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক ও তদারকি সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কারণ বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের একই ধরনের ওষুধ থাকলেও নাম, ফর্মুলেশন বা সংস্করণের পার্থক্যের কারণে দামে বড় ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে প্যারাসিটামলের বিভিন্ন সংস্করণের কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য, শুধু একটি সাধারণ জেনেরিককে অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় রাখলেই হবে না; বাজারে একই উপাদানের বিভিন্ন সংস্করণ কীভাবে মূল্য নির্ধারণ করছে, সেটিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি।
সংগঠনটির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেনের দাবি, সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের পর্যাপ্ত মতামত ছাড়াই আগের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। শুরু থেকেই তারা ওই তালিকার বিরোধিতা করে আসছিলেন বলে জানান তিনি।
তার মতে, সরকার যদি মনে করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তাহলে সরকারি বাজেটের মাধ্যমে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) সক্ষমতা ব্যবহার করা যেতে পারে। বেসরকারি ওষুধশিল্পের ওপর একই ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রয়োজন নেই বলেও মত দেন তিনি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে নতুন তালিকা তৈরির সময় সরকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নেবে।
নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। গত ১০ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সহকারী সচিব রফিকুজ্জামান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ সংক্রান্ত পাঁচটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে নতুন তালিকা ঠিক কী প্রক্রিয়ায় তৈরি হবে, কোন কোন মানদণ্ডে ওষুধ অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কীভাবে দাম নির্ধারণ করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত পরিষ্কার হয়নি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা শুধু একটি প্রশাসনিক নথি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক সক্ষমতা।
সরকারের যুক্তি হলো, আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় ২০২৬ সালের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করেই তালিকাকে কার্যকর করা যেত।
এখন সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—নতুন তালিকা যেন একদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ওষুধের দাম রাখে। একই সঙ্গে দেশীয় ওষুধশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
সব পক্ষের মতামত নিয়ে স্বচ্ছ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও নিয়মিত হালনাগাদযোগ্য একটি কাঠামো তৈরি করা না গেলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাবে। আর এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সেই সাধারণ রোগীর ওপর, যার কাছে ওষুধের দাম ও প্রাপ্যতাই চিকিৎসা পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।
সান নিউজ/ জামান
