দীর্ঘদিনের সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর লেবাননকে কেন্দ্র করে নতুন এক যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৯ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
ইসরায়েলের একাধিক কর্মকর্তা এবং হিজবুল্লার ঘনিষ্ঠ সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, উভয় পক্ষই সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এর ফলে কয়েক মাস ধরে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির আশা দেখা দিয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। হিজবুল্লার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পরও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী একাধিক অভিযান পরিচালনা করে। যদিও পরে ওই অঞ্চলে বড় ধরনের কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনেই তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা পর দক্ষিণ লেবাননের একটি মহাসড়কে ড্রোন হামলার ঘটনায় দুই মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে হামলার জন্য কারা দায়ী, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
কূটনৈতিক তৎপরতায় যুদ্ধবিরতি
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার এবং ইরানের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও আলোচনার ফলেই এই যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, সাম্প্রতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ঘটলেও সামগ্রিকভাবে যুদ্ধবিরতি বজায় থাকবে বলে তারা আশাবাদী।
দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলা হিজবুল্লা বহু বছর ধরে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালে সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে ব্যাপক অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
সে সময়ের অভিযানে হিজবুল্লার শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হন এবং সংগঠনটির সামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তাদের সাংগঠনিক কাঠামোও বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়ে।
ভঙ্গুর ছিল আগের যুদ্ধবিরতি
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সীমান্ত এলাকায় ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের কারণে বারবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
চলতি বছরের শুরুতে আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরপর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হলে উভয় পক্ষের ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।
প্রাণহানি ও মানবিক সংকট
লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে দেশটিতে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে হিজবুল্লার সঙ্গে সংঘর্ষে ইসরায়েলও সামরিক ও বেসামরিক হতাহতের মুখোমুখি হয়েছে। দুই পক্ষের এই দীর্ঘ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছিল।
নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে অঞ্চলটিতে শান্তি ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় পরিস্থিতির ওপর এখনও সতর্ক নজর রাখছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
সূত্র : রয়টার্
