করোনাকালে গাছের সাথে সখ্যতা। কোভিড আক্রান্ত হয়ে যখন সবাইকে ছাড়া একা থাকতে হয়েছিল, তখন নিজের সঙ্গী হিসেবে ছিল রুমের ব্যালকনিতে থাকা কয়েকটি গাছ। নিজের পরিচর্যার সাথে সাথে গাছের পরিচর্যাও শুরু করেন, সময় কাটান গাছের সাথে। সেই থেকেই সঙ্গী হয়ে যায় গাছ। কোভিড সেড়ে উঠার পর ইনডোর প্লান্ট সংগ্রহে ঝুঁকেন তানজিলা আঁখি। শখের বাগান হয়ে উঠে উপার্জনের মাধ্যম। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এখন তার মাসে আয় গড়ে দুই লাখ টাকারও বেশি।
নিজের বাগানে রয়েছে ১১৪৮ প্রজাতির প্লান্ট। যার বেশির ভাগই ইনডোর প্লান্ট। তানজিলার বাগানে টেট্রাস্পার্মা ওরিয়া ভেরিগেডেট জাতের একটি গাছ রয়েছে যা বাংলাদেশ মাত্র ১ টিই রয়েছে বলে তার দাবি। শখের বাগান এখন জীবিকা উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
মাদারীপুর জেলার শিবচরে নিজের বাড়িতে গড়ে তোলা তানজিলা আঁখির শখের বাগান ঘুরে দেখা গেছে, নানা প্রজাতির ছোট-বড় গাছের চারা। বাগানে থাকা গাছের মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ গাছই ‘ইনডোর প্লান্ট’ বলে তিনি জানান। প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বাগানে পরিচর্যার কাজে সময় দেন তানজিলা। এছাড়াও গাছ কুরিয়ার করে ক্রেতাদের নিকট পাঠাতে আরও ২/৩ ঘন্টা ব্যয় হয়। শখ থেকে বাগান শুরু। এরপর অনলাইনে কেনা-বেচা শুরু করেন। এরই মধ্যে ইনডোর প্লান্ট নিয়ে নানা প্রশিক্ষন, সভা-সেমিনারে অংশ নেয়া, মেলায় নিজের গাছ নিয়ে স্টল দেয়াসহ গাছের অজানা তথ্য জানতে শুরু করেন। ২০১৯ সালে শখ থেকে গাছ কেনা শুরু। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে বাণিজ্যিক ভাবে বিক্রি শুরু করেন। নিজের ফেসবুক পেইজ ও ওয়েবসাইট এখন বিক্রির অন্যতম মাধ্যম। ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে গাছপ্রেমী তানজিলা আগামীতে অর্কিড নিয়েও কাজ করবেন বলে জানান।
জানতে চাইলে তানজিলা আঁখি বলেন,’কোভিড থেকে সেড়ে উঠার পর নার্সারী করার প্ল্যান করি। এরই মধ্যে ইনডোর প্লান্ট নিয়ে কাজ শুরু পরিকল্পনা মাথায় আসে। প্রচলিত গাছের বাইরে এসে ব্যতিক্রমী হিসেবে ইনডোর প্লান্ট নিয়ে কাজ শুরু করি। ৭৮ হাজার টাকা ব্যয়ে সাকুলেন্ট প্ল্যান্টসহ ৭/৮ প্রজাতির গাছ সংগ্রহ করি। তখন চাকুরির সুবাদে ঢাকার মালিবাগে থাকি। সে সময়ই গাছ সংগ্রহ করি। পরে স্বামীর কর্মস্থল নরসিংদী চলে যাই। সেখানে সব গাছ নিয়ে একটু বড় পরিসরে বাগানের কাজ শুরু করি। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নরসিংদী থেকে নিজ বাড়িতে শিফট করি। সব গাছ নিয়ে এসে নিজের বাড়িতেই বাগান শুরু করি। ৮ শতাংশ জমিতে এখন ১১৪৮ প্রজাতির প্লান্ট রয়েছে।’
তানজিলা আঁখি বলেন,’আমার বাগান থেকে ঢাকার বিভিন্ন কর্পোরেট অফিসে গাছ যায়। এছাড়াও ঢাকার অভিজাত এলাকার নিয়মিত ক্রেতা রয়েছেন। যারা নানা প্রজাতির ইনডোর প্লান্ট সংগ্রহ করে থাকেন। সব চেয়ে বেশি বিক্রি হয় ফিলোডেন্ড্রোন, এ্যাগলোনিমা, স্নেকপ্লান্ট, এন্থোরিয়াম, মনস্টেরা, ফিটোনিয়া গাছগুলো। এছাড়াও রঙিন ক্যাকটাস, হার্ভ প্ল্যান্ট, স্টেভিয়া, কিডনিপ্ল্যান্ট, ইনসুলিনও বিক্রি হয় প্রচুর। বেশির ভাগ গাছই থাইল্যান্ড থেকে প্রথমে আনা হয়েছে। এরপর আমার এখানে আরও উৎপাদন করা হয়।’
তিনি আরও বলেন,’ঢাকার গ্রীণবাংলা নামের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। ২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে গাছ নিয়ে পরিপূর্ণ ভাবে কাজ শুরু করি। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে ইনডোর প্ল্যান্টের উপর ছয় মাসের উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নিই। বর্তমানে আমার বাগানে প্রায় ২৫ লাখ টাকার প্লান্ট রয়েছে। মাসে ২ লাখ টাকার বেশি গাছ বিক্রয় করে থাকি। বাগানের পরিধি আরও বাড়ানোর ইচ্ছা আছে। অর্কিড নিয়ে কাজ করবো আগামীতে।’
তানজিলা আঁখি আরও বলেন,’আমার বাগানে টেট্রাস্পার্মা ওরিয়া ভেরিগেডেট জাতের একটি গাছ রয়েছে। ত্রিশ হাজার টাকা মূল্যের গাছটি খুবই বিরল। ওই গাছ থেকে একটি চারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। গাছটি ছয় মাসে একটি করে পাতা দেয়।’
তানজিলা আঁখির স্বামী বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মো. বিল্লাল হোসেন বলেন,’আমার স্ত্রী শখ থেকে এখন সফল উদ্যোক্তা। গাছ নিয়ে ওর এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। ওর সাথে সকল কাজেই আমি সাপোর্ট দেই। সম্প্রতি ঢাকায় গাছের একটা মেলা করে এসেছি। এখন গাছ নিয়েই আমাদের সংসার। অন্যরকম ভালোবাসা তৈরি হয়েছে গাছের প্রতি। Wonder Garden BD নামের ফেইসবুক পেইজ রয়েছে ওঁর। ওয়েব সাইটও আছে। বেশির ভাগ প্লান্ট অনলাইনেই বিক্রি হয়।’
স্থানীয়রা জানান,’তানজিলার শখের বাগানে অসংখ্য গাছ। নানা রঙের ইনডোর প্লান্ট রয়েছে এখানে। একজন নারী হয়ে এই ধরণের গাছ বিক্রি করেও মাসে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করা যায়, তা দেখিয়ে দিয়েছেন তানজিলা।’
প্রতিবেশী মিলন বলেন, ‘তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা। তাঁর পরিচর্যায় এত সুন্দর একটি বাগান গড়ে উঠেছে, এ জন্য আমরা এলাকাবাসী গর্বিত। এত সুন্দর বাগান আগে দেখিনি। একজন নারী হয়েও যেভাবে পরিশ্রম করে তিনি বাগানটি গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
আরেক প্রতিবেশী সাজ্জাদ হোসেন খান বলেন, ‘শিবচরের মতো জায়গায় এমন পরিবেশবান্ধব নার্সারি এই প্রথম দেখলাম। নতুন ও পুরোনো উদ্যোক্তাদের সবারই উৎসাহ পাওয়া উচিত। আমরা তাঁদের সাধুবাদ জানাই।’
শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামান খান বলেন, ‘এ ধরনের তরুণ উদ্যোক্তাদের কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। শিবচরের অধিকাংশ তরুণ জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমান। এ পরিস্থিতিতে কৃষি ও নার্সারিভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণেরা যাতে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন, সে জন্য তাঁদের সর্বোচ্চ উৎসাহ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’
ইনডোর প্লান্টসহ বিদেশী নানা জাতের গাছ ও অর্কিড নিয়ে বড়সড় একটি বাগান তৈরির স্বপ্ন তানজিলা আঁখির। নিজ বাড়ির ৮ শতাংশ জমির বাগানটি এখন হাজারো প্রজাতির বিদেশী গাছে পূর্ণ। কোভিড আক্রান্ত হয়ে নিঃসঙ্গ সময় কাটানোর একমাত্র সঙ্গী গাছ এখন তার জীবনেরই সঙ্গী হয়ে উঠেছে। চাকরি ছেড়ে হয়ে উঠেছেন একজন সফল উদ্যোক্তা। অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর কাজ করার মানসিকতা থাকলে লক্ষ্যে পৌছানো কোন কঠিন কাজ নয় বলে বিশ্বাস করেন উদ্যোক্তা তানজিলা আঁখি।
সাননিউজ/বান্না
