মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় জমে থাকা কালো মেঘ এবার সরাসরি আঘাত হানল প্রবাসীদের রক্তে-ঘামে গড়া জীবনে। সৌদি আরবের ব্যস্ততম রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের রক্তক্ষয়ী হামলায় ঝরে গেছে ১২টি তাজা প্রাণ।
বহুদেশীয় এই ট্র্যাজেডিতে সবচেয়ে বড় বেদনার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ, কারণ এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন প্রবাসী বাংলাদেশিও। জীবিকার সন্ধানে ভিনদেশে পাড়ি জমানো এই মানুষগুলোর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে দেশের পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে এক অজানা আর্তনাদ।
গতকাল শনিবার সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেওয়া এক বিবৃতির সূত্রে আল জাজিরা জানিয়েছে, কিং খালেদ বিমানবন্দরে চালানো ওই ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতদের তালিকাটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও হৃদয়বিদারক। চারজন স্থানীয় সৌদি নাগরিকের পাশাপাশি এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন বাংলাদেশি।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের একজন করে নাগরিকও এই হামলায় মৃত্যুবরণ করেছেন। বিস্ফোরণের পর পরই বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার ফলে জরুরি ভিত্তিতে সেখানকার সমস্ত ফ্লাইট অপারেশন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধের ডামাডোল বেজেছিল, উপসাগরীয় আরব অঞ্চলের বুকে এটিই সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক রূপকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো রিয়াদ শহর। একে আন্তর্জাতিক ব্যবসা, ভ্রমণ ও সংস্কৃতির গ্লোবাল হাব হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
কিন্তু এই ধরনের ধারাবাহিক ও ধ্বংসাত্মক হামলা সৌদি যুবরাজের সেই মেগা পরিকল্পনাগুলোকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এমনকি সামনের দিনগুলোতে রিয়াদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক ইভেন্ট ও সম্মেলনগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে হামলার দায় স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি হুতি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটির শীর্ষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতির দাবি, ইয়েমেনে সৌদি জোটের অব্যাহত বিমান হামলার জবাবেই এই পাল্টা আঘাত হানা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ইয়েমেনের সাধারণ বিমানবন্দর, বন্দর, বাজার ও চিকিৎসালয়ের মতো বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হলে তা যেমন অন্যায়, ঠিক তেমনি আন্তর্জাতিক মহলের উচিত সব দেশের নাগরিক ও কাঠামোর নিরাপত্তাকে সমান চোখে দেখা।
সৌদি সরকারি বা কূটনৈতিক মহল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো না হলেও পরিস্থিতি এখন বেশ থমথমে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক ঘটনাস্থলের দিকে অন্তত ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুতগতিতে ছুটে যেতে দেখেছেন।
পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে দেশটির বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিমানবন্দরের সমস্ত গেট। ভিনদেশের মাটিতে এমন নির্মম হামলায় দুই বাংলাদেশির প্রাণহানির খবর আসার পর থেকেই দেশজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সান নিউজ / রাজীব
