বদলে যাওয়া বিশ্বরাজনীতি ও মার্কিন-পাক সম্পর্কের পুনরুত্থান: এক নজরে
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও পাক স্বস্তি: শুল্ক নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সম্পর্ক যখন আস্থার সংকটে ভুগছে, তখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক চাঙ্গা করে তুলেছে পাকিস্তান।
সম্পর্কের মোড় ঘোরানো ঘটনা: ২০২১ সালের কাবুল বোমা হামলার সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাতে মার্কিন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর হোয়াইট হাউসের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি, পাকিস্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ার সুবাদে ইসলামাবাদের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।
আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ও চ্যালেঞ্জ: ট্রাম্পের নিম্নমুখী জনপ্রিয়তার মাঝে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে মার্কিন নীতি পাকিস্তানের চেয়ে ভারতের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা, যা ইসলামাবাদের ভবিষ্যৎ কূটনীতির জন্য বড় এক পরীক্ষা।
বিশ্ব ভূরাজনীতির সমীকরণ প্রতিনিয়ত এক অদ্ভুত ও জটিল মোড় নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সম্প্রতি নিউইয়র্কের এক বিশেষ সমাবর্তনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বিশ্বের বড় বড় দেশের জন্যই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুল্ক নীতির মারপ্যাঁচ এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মতো গুরুতর ইস্যুগুলো বিশ্ব অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ঐতিহ্যগত মিত্ররা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের বর্তমান নীতি নিয়ে গভীর আস্থার সংকটে ভুগছে।
ইউরোপ থেকে শুরু করে সুদূর পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত আমেরিকার নিরাপত্তা বলয়ের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন বিকল্প কূটনৈতিক অংশীদার বা নতুন মিত্র খোঁজার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি আচরণ ও প্রকাশ্য সমালোচনার মুখে বহু পুরনো মিত্র দেশের শীর্ষনেতারাও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
তবে বৈশ্বিক এই অনিশ্চয়তা ও টালমাটাল পরিস্থিতির ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের শীতল ও প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকে যাওয়া সম্পর্কটি সম্প্রতি অবিশ্বাস্য এক গতিশীলতা লাভ করেছে। আমেরিকার বর্তমান প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের কাছে পাকিস্তানের কূটনৈতিক গুরুত্ব এখন আকাশছোঁয়া।
অথচ এই উষ্ণ সম্পর্কের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে; যেখানে বিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করা এবং সামরিক প্রভাবকে আরও পাকাপোক্ত করার অভিযোগ উঠছে বর্তমান পাকিস্তানি প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে লড়াই করতে হচ্ছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ময়দানে ট্রাম্প ও তার দলের নিরঙ্কুশ বিজয় কামনা করছে যে কয়েকটি রাষ্ট্র, পাকিস্তান তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতে আফগানিস্তান সংকট এবং অন্যান্য ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটেছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনগুলোর নীতিতে নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সখ্যতা তীব্র আকার ধারণ করায় ইসলামাবাদ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের শুরুর দিকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে।
গত বছরের মার্চ মাসে কাবুলের বিমানবন্দর এলাকায় সংঘটিত এক ভয়াবহ বোমা হামলার মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতারে গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রশংসিত হয় পাকিস্তান। এরপর গত মে মাসে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা ও তৎপরবর্তী ভারত-পাকিস্তান চার দিনের আকস্মিক সামরিক সংঘাতে দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। ওই সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব দাবি করে প্রথম যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
যদিও ভারত সেই মধ্যস্থতার দাবি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছিল, তবুও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব হোয়াইট হাউসে উষ্ণ অভ্যর্থনা লাভ করে। ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস এবং খনিজ সম্পদ থেকে শুরু করে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির মতো কৌশলগত খাতে মার্কিন বাণিজ্যিক সহযোগিতার দরজা খুলে যায়।
ইসলামাবাদের সানোবার ইনস্টিটিউটের পরিচালক কামার চিমার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল নিরাপত্তাকাঠামোর এক অপরিহার্য ও শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট অব পিসের বিশ্লেষক ইমরান খানের অভিমত হলো, ট্রাম্পের সঙ্গে বিশেষ কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর থেকে সরাসরি বড় কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা হয়তো পায়নি ইসলামাবাদ।
তবে বর্তমান মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বর্তমানে বেশ নিম্নমুখী। ডেমোক্র্যাটরা যদি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে সক্ষম হয়, তবে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পটপরিবর্তন আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত ও চুক্তিভিত্তিক ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার পাশাপাশি মার্কিন নীতি পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
প্যারিসের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বুসোল মন্ডিয়ালের বিশেষজ্ঞ গ্রেস ওয়ার্মেনবলের মতে, আসন্ন এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল কেবল স্বল্পমেয়াদি মার্কিন নীতিকেই প্রভাবিত করবে না, বরং আগামী বছরগুলোতে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতার পালাবদলেরও চাবিকাঠি হতে পারে।
এই পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকাটাই এখন ইসলামাবাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কামার চিমা মনে করেন, কেবল হোয়াইট হাউসের বর্তমান ক্ষমতার সমীকরণের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর না করে নিজেদের মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক গুরুত্ব এবং মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় কার্যকারিতাকে টিকিয়ে রাখাই পাকিস্তানের মূল শক্তি হওয়া উচিত।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব ভবিষ্যতে হ্রাস পেলে স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতির বড় কোনো অবনতি না ঘটলেও, পাকিস্তানের বর্তমান কূটনৈতিক সুদিনের যে অবসান ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, সে বিষয়েও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সান নিউজ / রাজীব
