রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ। এমন জঘন্যতম নৃশংসতার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিবাদ হচ্ছে দেশের বাইরের বাঙালি কমিউনিটিতেও। তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলছে।
পল্লবী থানায় এলাকাবাসীর বিক্ষোভ, মিরপুরে সড়ক অবরোধ এবং মুন্সীগঞ্জে মশাল মিছিলের মাধ্যমে ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে। খোদ আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ এবং দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দিয়ে বিচারকাজ সম্পন্ন করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
সর্বশেষ খবরে বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসার পরিবারের সঙ্গে তাদের পল্লবীর বাসায় দেখা করে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের আবেদন জানিয়েছেন। তবে রামিসা হত্যাকাণ্ড দেশের চলমান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক দায়িত্বহীনতা, আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ; এমনই বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত ১৬ মাসেই দেশে ৫২২ জন নিষ্পাপ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৮৯০ জন শিশু-কিশোরী চরম নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাইকোথেরাপিস্টদের মতে, মাদকের অবাধ বিস্তার, সাইবার দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি, পারিবারিক অস্থিরতা, পরকীয়া এবং সামাজিক মূল্যবোধের চরম ধসের কারণে আজ কোমলমতি শিশুরা বড়দের ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষোভ ও লালসার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট থেকে মুক্তির জন্য কেবল কঠোর আইনই নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি।
এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ আইনমন্ত্রীর: রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বৃহস্পতিবার ডিএমপি কমিশনারকে আইনমন্ত্রী এই নির্দেশ দেন বলে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের একই কর্মকর্তা বলেন, আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নৃশংস ঘটনার বিচারকাজ সম্পন্ন করতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চিৎকার শুনেছিলাম, সেটা যে আমার মেয়ে বুঝতে পারিনি: রামিসার মায়ের ভাষ্য, মেয়েকে যখন নির্যাতন করা হয় তখন তার চিৎকার শুনতে পান তিনি। কিন্তু কল্পনায়ও ভাবতে পারেননি তার নিজের মেয়েই চিৎকার করছে। যখন বুঝতে পারেন মেয়ে নিখোঁজ, তখন খোঁজাখুঁজি শুরু করলেও ততক্ষণেই ঘাতকের লালসার শিকার হয়ে জীবন হারিয়েছে শিশুটি।
রামিসার মা পারভিন আক্তার বলেন, চিৎকার শুনেছিলাম, কিন্তু আমার মেয়েই যে চিৎকার দিচ্ছিল সেটা বুঝতে পারিনি। আমি মনে করেছি ওর সঙ্গে (বড় বোন রাইসার) গেছে। এরপর দেখি ও (বড় মেয়ে) একা আসছে। তখনই আমি বুঝতে পেরেছি, খোঁজ শুরু করেছি। দরজা ধাক্কা দিয়েছি। সব ফ্ল্যাটের দরজা খুলছে, কিন্তু এই ঘরের দরজা খোলেনি।
হত্যার পেছনে কোনো কারণ থাকতে পারে কি না জানতে চাইলে পারভিন আক্তার বলেন, কারণ কিছুই না, লালসা। আমার মেয়ে মাত্র দরজা খুলছে। একটা জুতা পরা, আর একটা জুতা পরতেও পারেনি। টান দিয়ে নিয়ে গেছে। একটা জুতা পড়ে থাকা দেখেই সন্দেহ হয়। তখনই এই দরজায় ধাক্কা দেই। পরে সব লোকজন এসে দরজা ভেঙেছে। পেছনের বাড়ির লোকজন তাকে ওই দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে দেখেছে।
বড় বোন রাইসার বলে, রাস্তার ওই পাশেই আমার চাচার বাসা। আমি চাচার বাসায় যাচ্ছিলাম। বোন আমার সঙ্গে বের হতে চাইছিল। আমি বলেছি ঘরে যাও। এরপর আমি ওকে রুমে রেখে বের হয়ে যাই। এরপর সে আমার পিছে পিছে বের হয়ে আসলেও আমি লক্ষ্য করিনি। তখনই দরজার বাইরে থেকে লোকটা ওকে টান দিয়ে নিয়ে গেছে। ও চিৎকার করেছিল, আম্মু শব্দ শুনেছে।
পল্লবী থানায় ঢুকে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ: পল্লবী থানার ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ করে অপরাধীর দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।
বৃহস্পতিবার সকালে পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে বিক্ষোভ করে সহপাঠী এবং এলাকাবাসী। এ সময় দ্রুত বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানান তারা। এলাকাবাসী হত্যার দ্রুত বিচারের বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে থানায় যান। এ সময় থানা পুলিশ এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার কথা বলেন।
বহু বছর ধরে চলতে থাকা নৈতিক অবক্ষয়-মির্জা ফখরুল: সাম্প্রতিক ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বহু বছর ধরে চলতে থাকা নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক দায়িত্বহীনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের দ্রুত পতনের ভয়াবহ প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।
চার্জশিট দ্রুত দেওয়া হবে-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বাকি বিচারের দায়িত্ব আইন বিভাগের। আমরা আশা করি সম্ভাব্য সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে রামিসা ও সাম্প্রতিক ইস্যুতে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত: শিশু রামিসা আক্তারকে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে দাফন করা হয়েছে। গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে জানাজা শেষে উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্য শিয়ালদী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
এর আগে বুধবার রাত ৮টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রামিসার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজন ও এলাকাবাসীর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
মিরপুরে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ: আসামির ফাঁসির দাবিতে মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর ১০ থেকে ১২ নম্বর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধরা। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয় যায়।
এ সময় বিক্ষুব্ধদের ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘বিচার চাই, বিচার চাই’, ‘আমার বোন খুন হলো কেন’, ‘অপরাধীর আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, আসামির ফাঁসি চাই’Ñইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা যায়।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির: সারা দেশে ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বৃহস্পতিবার সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের সই করা এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত শিশু হত্যা, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতন হচ্ছে। এইচআরএসএস’র সংগৃহীত তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে অন্তত এক হাজার ৮৯০ জন শিশু ও কিশোরী নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়া বিচারহীনতার ইঙ্গিত: দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে শিশুধর্ষণ ও শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে শিশুধর্ষণ বেড়েছে ৭৬ দশমিক ১ শতাংশ। যৌন নির্যাতন বেড়েছে ৭০ দশমিক ৩২ শতাংশ। হত্যা বেড়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। বিগত বছরে ৪ হাজার ৩৮১ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যার মধ্যে ২ হাজার ৮৮ শিশুর অপমৃত্যু হয়েছে এবং ৪৪৮শিশু খুন হয়েছে। ১ হাজার ৩৮৩ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যা বিগত বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
শিশুদের নিয়ে কাজ করা ২৭২টি এনজিও-এর জাতীয় নেটওয়ার্ক ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’— বিএসএএফ। ‘শিশু অধিকার পরিস্থিতি-২০১৯’ প্রতিবেদনে ফোরাম এ তথ্য তুলে ধরেছে। তবে ২০১৯ সালে মাত্র ২৪টি শিশুহত্যা মামলা এবং ২৭টি শিশুধর্ষণ মামলার রায়ের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বলে সংবাদ মনিটর করে পাওয়া গেছে। এটা শিশুর প্রতি সহিংসতা, বিচারহীনতা এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত বহন করে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন।
বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে ‘শিশু অধিকার পরিস্থিতি-২০১৯’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই তথ্য তৈরি করেছে।
বিশেষ বেঞ্চ গঠনে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন: শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলো থেকে উদ্ভূত ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি দ্রুততম সমযের মধ্যে করার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনে প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন করেছেন আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবার তারা এ আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, আমরা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করছি, দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘ সূত্রিতা এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরুপ প্রভাব ফেলছে, বিভিন্ন সমযে অধস্তন আদালতে চাঞ্চল্যকর, নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার হলেও, হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল এবং আপিল বিভাগের আপিল শুনানি করতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
১৬ মাসে ৫২২ শিশু হত্যা: মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৬ মাসে (২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল) হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৫২২ শিশুকে। গড়ে মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। এ সময়ে ধর্ষণসহ চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ২২৩ শিশু। গড়ে মাসে ৭৬ জনের বেশি শিশু ধর্ষণসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের অবাধ ব্যবহার, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, সাইবার দুনিয়ার প্রতি নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি ও পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে পড়ার শিকার হচ্ছে শিশুরা। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা পরিবারে শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলছে। বড়দের ব্যক্তিস্বার্থ ও লোভ-দ্বন্দ্বের কাছে নৃশংস হয়ে উঠছে কোমলমতি শিশুর স্বস্তির পৃথিবী। প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো, প্রতিশোধ কিংবা অপরাধ আড়াল করতে কখনো মা-বাবাসহ আপনজন হয়ে উঠছেন শিশুদের ঘাতক।
সাইকোথেরাপিস্ট নুসরাত সাবরিন চৌধুরী বলেন, ‘শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা শুধু একটি সামাজিক অপরাধ নয়, এটি একটি গভীর মানসিক ও মানবিক সংকট, যা শিশুর নিরাপত্তাবোধ, বিশ্বাসের ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশে সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনার বৃদ্ধি কোনো একক কারণে নয় বরং সামাজিক, পারিবারিক, ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মিলিত ফল। বর্তমানে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন একদিকে অগ্রগতি আনলেও অন্যদিকে শিশু-কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।’
নুসরাত সাবরিন চৌধুরীর আরও বলেন, ‘একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু ঘটনার মুহূর্ত নয় বরং পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া ভয়, উদ্বেগ এবং মানুষের প্রতি আস্থাহীনতা। অনেক শিশু নীরবে ভেঙে পড়ে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাদের সম্পর্ক, শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্রতিফলিত হয়। এটি শুধু একটি সামাজিক বা নৈতিক সংকট নয়, বরং একটি গুরুতর আইনি বিষয়ও। দেশে শিশু সহিংসতায় দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা- এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে বাস্তব অগ্রগতি সম্ভব। সেই সঙ্গে পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সব স্তরে সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘বড়দের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব হলে শিশুরা প্রতিশোধের বিষয়বস্তু হয়ে উঠছে। মা-বাবাও সন্তানকে হত্যা করছে। পরিবারের পুরুষের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত থাকলে শিশুরা হচ্ছে তার প্রধান শিকার। স্বজনদের হাতে শিশু নির্যাতন এ দেশে খুবই স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। হত্যার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় শিশুহত্যা দিন দিন বাড়ছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।’
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘পারিবারিক সহিংসতা কমাতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন হয়েছে। শুধু আইন হলেই হবে না, আইনের প্রয়োগ দরকার। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পরকীয়া অনেক বেশি বেড়েছে। মানুষের মধ্যে যে ধৈর্য থাকা দরকার তা নেই। নৈতিকতা, মূল্যবোধ কমে গেছে। এসব মানসিক অস্থিরতা পারিবারিক সহিংসতার মূল কারণ।’
সাননিউজ/আরএ
